জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। শনিবার (৪ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। সংলাপে “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ: আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির।

মূল প্রবন্ধে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সফল গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে যে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে ৮ আগস্ট ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী জনগণের ইচ্ছা (Will of the People) এই সরকারের বৈধতার স্বীকৃত উৎস। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়ে এর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ:

অ্যাডভোকেট শিশির মনির তার প্রবন্ধে বৈশ্বিক নজির টেনে বলেন, ফ্রান্স, ইরান, ফিলিপাইন বা মিশরের মতো দেশগুলোতেও বিপ্লব পরবর্তী সরকার গঠিত হয়েছে এবং আদালত জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকেই চূড়ান্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশেও সুপ্রিম কোর্ট তার বিভিন্ন রায়ে (যেমন: সিভিল পিটিশন ৭৮১/২০২৫) এই সরকারের বৈধতা ও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে (Constituent Power) স্বীকৃতি দিয়েছেন।

তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের কথা প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়:

সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা: অতীতে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংসদে কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও এটি সংস্কারের পথে অন্তরায় হতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অভাব: প্রবন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনের আগের ও পরের অবস্থানের পরিবর্তনের সমালোচনা করা হয়। বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের পূর্ববর্তী ‘সার্বভৌম জনরায়’ সংক্রান্ত বক্তব্যের বিপরীতে বর্তমান ধীরগতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দোহাই সংস্কারের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বক্তাদের অভিমত: সংলাপে উপস্থিত অন্যান্য আলোচকরা বলেন, জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির স্বার্থে নয়, বরং দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সংবিধান সংশোধনের চেয়ে ‘সংবিধান সংস্কার’ প্রক্রিয়াই হবে সহজ ও টেকসই সমাধান। তারা হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, অতীতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চার ফলে যেভাবে শাসনব্যবস্থার পতন হয়েছে, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

গোলটেবিল সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষারই পরিপূরক। এই সুযোগকে কোনো অজুহাতে হাতছাড়া করা সমীচীন হবে না। বক্তারা অবিলম্বে গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে কী-নোট স্পিকারের বক্তব্য রাখেন- সংবিধান ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

Untitled

অতিথি আলোচক ছিলেন - রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) আক্তারুজ্জামান, জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলা ফাউন্ডেশন প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী, গণ অধিকার পরিষদ মুখপাত্র ফারুক হাসান, এনসিপি যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, সাবেক সচিব ও রাজনীতিবিদ এএফএম সোলায়মান চৌধুরী, রাজনীতিবিদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকীব আলী, সাবেক সিনিয়র সচিব ড এ কে এম কবিরুল ইসলাম, সাবেক সচিব সরকার আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন লিপু, বিডিজবস এর প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর, প্রফেসর লে. ক আকরাম আলী জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান, ব্যারিষ্টার বেলায়েত হোসাইন, এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, মেজর (অব) মোজাম্মেল হোসাইন, মেঃ জেঃ (অব) আমসাআ আমিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত কর্নেল (অব) আশরাফ আল দীন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ মেজর (অব) আফসারী আমিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর (অব) মেসবাহুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট তাসমিন রানা।

সভাপতির বক্তব্য রাখেন নেক্সাস ডিফেন্স এন্ড জাস্টিস প্রেসিডেন্ট ব্রি জে মোহাম্মদ হাসান নাসির।

উপস্থাপনায় নেক্সাস ডিফেন্স এন্ড জাস্টিস লীড মেম্বার ক্যাপ্টেন (অব) জাহাঙ্গীর, রাব্বুল ইসলাম খান, মেজর (অব) আবদুল্লাহ আল ফারুকী