করিডোর চালুর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ তৈরি হবে

*চীনের কুনমিং প্রদেশ এবং মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে

মুহাম্মদ নূরে আলম: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এই সফরে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার’ (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; তা বাস্তবায়ন হলে ট্রানজিট ও বন্দর মাশুল বাবদ বছরে সম্ভাব্য প্রায় ১৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি রাজস্ব আয় হবে। এই করিডোর চালু হলে চীন ও মিয়ানমারে অতিরিক্ত রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে; ফলে বার্ষিক রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে সম্ভাব্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। পণ্য পরিবহন খরচ কমবে সম্ভাব্য ৩০% এবং সময় বাঁচবে প্রায় ১২ থেকে ১৫ দিন। শিল্প ও লজিস্টিকস খাতে ৮ থেকে ১০ লক্ষ মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি হতে পারে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় চীনের শীর্ষস্থানীয় ১২টি কোম্পানির দেওয়া ৯.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগের অফার ঢাকাকে সম্ভাবনার শীর্ষে দাঁড় করিয়েছে। এটাকে ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের নতুন সমীকরণ মনে করছেন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

তবে তারা বলছেন, করিডোর চালুর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ তৈরি হবে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, ভারতের নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা এবং ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে সামাল দিয়ে এই মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য এক মস্ত বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। তবে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন আর কোনো নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র নয়, বরং আঞ্চলিক সংযোগের অন্যতম প্রধান ট্রাম্পকার্ড। বিসিএম করিডোর বাংলাদেশের ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি হতে পারে, যদি ঢাকা তার কূটনৈতিক দূরদর্শিতা বজায় রাখতে পারে। আসন্ন ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি চীনকে দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করাতে পারে এবং সমান্তরালভাবে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে আশ্বস্ত করতে পারে, তবে প্রাচ্যের এই ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক এবং অভূতপূর্ব জয় সুনিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চীনের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, যিনি ১৯৭৭ সালে তাঁর প্রথম সফরেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য চীনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলে সেই পুরোনো সম্পর্কের এক অভূতপূর্ব প্রতিফলন দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে। এই সফরে চীন ও বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ইস্যুতে সমন্বিতভাবে এগিয়ে যেতে দুই দেশের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ (২+২) সংলাপ অনুষ্ঠানের বিষয়ে উভয়পক্ষ চূড়ান্ত সম্মতি প্রকাশ করেছে। একই সাথে ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ যুক্ত হওয়ার পর থেকে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ বা কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় এবার বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরের মহাপরিকল্পনা সামনে এনেছে বেইজিং।

চীনের এই করিডোর যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সুচিন্তিত ও কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘সরকার চীনের প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করে দেখছে। এই ধরনের বড় আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক করিডোর আমাদের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দেশের সার্বিক জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক (যেটি চীন উইং হিসেবেও পরিচিত) অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ নূরে-আলম বলেন, বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি প্রাথমিক আলাপ আলোচনার মধ্যে রয়েছে। এটা পূর্ণ বাস্তবায়ন ও প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হতে আরও একটু সময় লাগবে।

বাংলাদেশ-চীন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, চীন যেহেতু আমাদের বিসিএম করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছে, তাই ঢাকাকে এখন অত্যন্ত শক্ত কূটনৈতিক কৌশল দেখাতে হবে। বেইজিংকে বোঝাতে হবে যে, মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গা সংকট যদি টেকসই সমাধান না হয়, তবে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই যাবে এবং চীনের এই বিপুল বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও সুরক্ষিত থাকবে না। এই সংকট সমাধানে আমাদের ভারতকে ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে যুক্ত করতে হবে। তাছাড়া, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি, যা আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান বৈশ্বিক রিসোর্স। এই পদটিকে আমাদের রোহিঙ্গা সংকটের পক্ষে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।”

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোর এবং চীনের ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) সফল করার যে লক্ষ্য রয়েছে, তার অংশ হিসেবে এই করিডোর থেকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ, বার্ষিক আয় এবং অন্যান্য সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে অনেক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিসিএম করিডোরটি পুরোপুরি সচল হলে বাংলাদেশের সরাসরি আর্থিক মুনাফা ও বার্ষিক আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। চীন এবং মিয়ানমারের পণ্য বাংলাদেশের ভূখ- ও বন্দর (বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পায়রা বন্দর) ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এই ট্রানজিট সুবিধা, বন্দর ব্যবহারের মাশুল এবং লজিস্টিকস খাত থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর আনুমানিক ১.৫ থেকে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৮,০০০ থেকে ৩০,০০০ কোটি টাকা) রাজস্ব আয় করতে পারবে। এই করিডোরের মাধ্যমে চীনের কুনমিং প্রদেশ এবং মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ফলে চীনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য এবং হিমায়িত মৎস্য রপ্তানি খরচ প্রায় ৩০% কমে যাবে। এতে করে বাংলাদেশের বাজারের নিত্যপণ্য যেমন: সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, শুকনো মরিচের দাম বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কমে পাওয়া যাবে। এতে চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বার্ষিক অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে চীনের সাথে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। করিডোরের কারণে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং সহজ যাতায়াতের ফলে এই ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে।

সূত্রে জানাযায়, বিআরআই প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ ইতিপূর্বে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে (যেমন পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল ইত্যাদি)। বিসিএম করিডোর এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক রূপ দেবে। এই করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার বা ঘুমধুম সীমান্ত হয়ে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে চীনের কুনমিং শহর পর্যন্ত সরাসরি রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট রুট নির্ধারিত না হলেও সম্ভাব্য সড়কপথে কুনমিং থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার হতে পারে। এর ফলে ঢাকা থেকে চীনের মূল ভূখ-ে পণ্য পৌঁছাতে যেখানে পানিপথে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগত, সেখানে সড়ক বা রেলপথে মাত্র ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। করিডোরের দুই পাশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড), টেক্সটাইল মিল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্ট এবং লজিস্টিকস হাব গড়ে উঠবে। এই শিল্পায়নের ফলে দেশের অন্তত ৮ থেকে ১০ লক্ষ তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। চীনের বিনিয়োগ প্রস্তাবের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি (সোলার ও উইন্ড পাওয়ার)। এর ফলে করিডোরভুক্ত শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে।