সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সেমিনারে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কয়েকটি গুরুতর অদক্ষতা দানা বেঁধে আছে। এর একটি হলো অর্থায়ন সংকট। দ্বিতীয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং আরেকটি হলো ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন তারা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনা আরো করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) সায়মা হক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল।

আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলিলী, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান সরদার এ নাঈম ও ব্যবসায়ী নেতা শাহদাত হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজধানীর মিন্টো রোডে সচিবদের যে ফ্ল্যাট আছে, সেগুলোর সুযোগ-সুবিধার বিবেচনায় সেগুলো বিলাসবহুল হোটেলকেও হার মানাবে। সরকারের এ ধরনের ব্যয়ের জন্য কে জবাবদিহি করবে, তা আলোচনার মধ্যে নেই। খরচের সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশ আগাতে পারবে না।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল হারে বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কতটা বেড়েছে, বেতন বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক—তার ব্যাখ্যা কোথায়? রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কার্যকারিতা কোথায় বেড়েছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান প্রয়োজন। সরকারের অপচয়মূলক প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। এসব ব্যয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিও দেখা যায় না।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কয়েকটি গুরুতর অদক্ষতা দানা বেঁধে আছে। এর একটি হলো অর্থায়ন সংকট। দ্বিতীয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং আরেকটি হলো ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদে হঠাৎ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; এর ব্যাখ্যা কী? নিয়োগের যৌক্তিক কারণ থাকলে তা প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এই সরকারের মধ্যেও আছে। আগেও এই সমস্যা ছিল, ভবিষ্যতে যেন তা আর না থাকে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে এমপি-মন্ত্রীদের সুযোগ–সুবিধা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি আরও বলেন, এমপিদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের এমপিরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান না। ভারতের সংসদের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এমপিদের বেতন-ভাতা বরং কম।

আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, নীতিগতভাবে এমপিদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত। তবে একটি শর্তে এমপি হওয়াটা হবে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব, কোনোভাবেই পার্টটাইম পেশা নয়। অনেকে এমপি হন মূলত ব্যবসা বা পেশাগত সুবিধা বাড়ানোর জন্য। সংসদ সদস্য পরিচয় ব্যবহার করে সচিবালয়, মন্ত্রী বা আমলাদের কাছে সহজে তদবির করা যায়, এটাই বাস্তবতা।

ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি পুরোপুরি দূর না করলেও অনেক সমস্যা কমাতে পারে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের কারণে ভারসাম্য আসতে পারে। তবে এর জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আংশিক ডিজিটাল হলেও বাস্তবে তা এখনো জটিল ও কাগজনির্ভর।

র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের সুশাসনের বিষয়টি দুই দিক থেকেই ভাবতে হবে। আমরা প্রায়ই উন্নয়ন বাজেট কমানোর কথা বলি, কিন্তু অপারেশনাল বাজেট কমানোর সুযোগও রয়েছে। একজন এমপি বা মন্ত্রীর কতগুলো গাড়ি প্রয়োজন, কেন তারা ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি পাবেন, কতজন কর্মী রাখা যৌক্তিক এসব প্রশ্ন তোলা দরকার। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

দুর্নীতি কমছে না উল্লেখ করে সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমরা যখন নীতির কথা বলি, তখন মূলত আর্থিক দুর্নীতির কথাই বলি। অথচ দুর্নীতির বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে আমরা সাধারণত তা উপেক্ষা করি। সরকার এত সংস্কারের কথা বলেছে, এত সংলাপ করেছে, কিন্তু একটি দৃশ্যমান উদাহরণও তৈরি করতে পারেনি।

ভোটাধিকার এখন নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়েছে: এদিকে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন: সংখ্যালঘু অধিকার, প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা” শীর্ষক গতকাল আরেকটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। ঐ সভায় আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং নির্বাচনের ওপর তাদের আস্থা বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।