শরিফ ওসমান হাদী হত্যার 'বিচার না হওয়া' পর্যন্ত শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ এবং শুক্রবার রাতভর তারা সেখানে অবস্থান করেছে। তবে সকালে শাহবাগ মোড় থেকে সরে আজিজ মার্কেট ও কাঁটাবনের দিকে অবস্থান নিয়ে সংগঠনটি জানায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওসমান হাদীর কবর জিয়ারতের পর তারা দুপুরে আবার শাহবাগে ফিরে আসবে। তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে ওসমান হাদীর কবর জিয়ারত করে চলে যাওয়ার পর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আবারও আন্দোলনকারীরা শাহবাগে এসে অবস্থান নেন।
গতকাল সকালের তুলনায় দুপুরে সেখানে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে দেখা গেছে। শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল আবার বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল থেকে মানুষ বাড়তে থাকে। অবস্থানকারীরা সেখানে সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে হাদী হত্যার বিচার দাবি করছেন। গতকাল বিকালে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব ও শহীদ ওসমান হাদীর সহচর আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমি যদি চলেও যাই, আপনারা দয়া করে ইনসাফের এই লড়াই থামাবেন না। আশা করি, আমি চলে গেলেও আপনারা এই লড়াই চালিয়ে যাবেন।
জাবের বলেন, এখানে অনেকেই আসবেন, অনেকেই কথা বলবেন কিংবা বলতে চাইবেন। দয়া করে আপনারা আমার কথার বাইরে অন্য কারও বক্তব্য ইনকিলাব মঞ্চের বক্তব্য হিসেবে ধরবেন না। আমার কথা ছাড়া অন্যদের কথা ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল বক্তব্য নয়। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আরও বলেন, কারণ এখানে অনেকে অনেক কথা বলবে, উসকে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তাই আমি এই কথা বলতে চাই, আমার বাইরে আর কারও কথা ইনকিলাব মঞ্চের কথা হিসেবে গণ্য করবেন না। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কয়জন উপদেষ্টার কি অবদান ছিল আমরা জানি। দুই-তিনজন উপদেষ্টা ছাড়া কারও কোনো অবদান নেই। অথচ তারা সবাই সচিবালয়ে বসে চেয়ার গরম করছে।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে রাতে সংবাদমাধ্যমকে বলা হয়েছে, তারা অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন, তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কর্মসূচি পালনের জন্য তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন। ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলনকারীরা শাহবাগ থেকে সরে যাওয়ার পর ওই এলাকায় তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। ওদিকে, ঢাকায় কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ইনকিলাব মঞ্চের চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর শাখা শনিবার স্থানীয়ভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। ইনকিলাব মঞ্চ শুক্রবার ভোর রাত সাড়ে চারটার দিকে তাদের কর্মসূচি সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে। সেখানে দেখা যায় তখনো আন্দোলনকারীদের অনেকে অবস্থান করছেন।
নরসিংদী থেকে মায়ের সঙ্গে রাজধানীর শাহবাগে আসা নূর মোহাম্মদ সাড়ে সাত বছরবয়সি শিশুটি গতকাল সকালে যোগ দিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে চলা আন্দোলনে। মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা, হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে বসে সকাল থেকে স্লোগান দিচ্ছে শিশু নূর মোহাম্মদ। নূর মোহাম্মদ বলেন, হাদী ভাই ইনসাফের দল করতেন, আমিও বড় হলে ইনসাফের দল করব। আমিও হাদী ভাইর মতো হতে চাই।
প্রসঙ্গত, শরিফ ওসমান হাদীর খুনিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে শাহবাগে বিক্ষোভের এ কর্মসূচি আগেই ঘোষণা করেছিল তার সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। ঘোষণা অনুযায়ী শুক্রবার জুমার নামাযের পর শাহবাগে অবস্থান নিতে শুরু করেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা। এক পর্যায়ে তারা টানা অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রাতে সেখানে অবস্থান করেছেন। কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে সমমনা বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা রাতে জমায়েতস্থলে গিয়ে স্লোগান দিয়ে হাদী হত্যার বিচার দাবি করেছেন। রাতভর শাহবাগ মোড়ে অবস্থানকারীদের মধ্যে কিছু নারী ও শিশুকেও দেখা গেছে।
‘বাংলাদেশের আজাদি, ওসমান হাদী’ ‘তুমি কে আমি কে, হাদী হাদী’, ‘বাংলাদেশের পতাকায় হাদী তোমায় দেখা যায়’ ‘ইনসাফের পতাকায় হাদী তোমায় দেখা যায়’, ‘তাকবীরের ধ্বনিতে হাদী তোমায় দেখা যায়’, ‘নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর’, ইত্যাদি স্লোগান দেন অবরোধ কর্মসূচিতে আসা ছাত্রজনতা। এসময় অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিলকারীরা বলেন, হাদীর হত্যার প্রধান আসামীকে হাজির করতে হবে। সেইসঙ্গে যথাযথ বিচার করতে হবে। সব খুনীকে হাজির না করা পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়বো না।
রেমিট্যান্স শাটডাউনের হুঁশিয়ারি
ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীর হত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছেন প্রবাসীরাও। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ সোমবারের মধ্যে মূল হত্যাকারীকে গ্রেফতার করতে না পারলে সম্পূর্ণভাবে রেমিট্যান্স শাটডাউন করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রবাসীদের একটি দল। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে এ কর্মসূচির ডাক দেন ইতালি প্রবাসী সাইফুর রহমান। তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, শহীদ বীর শরিফ ওসমান বিন হাদী ভাইয়ের খুনিদের ধরা দূরে থাক, দেশে আছে কিনা সেটাই জানে না ইন্টেরিম, অথচ বামপন্থী মিডিয়ার আস্তানায় হামলায়; সমানে বাছ-বিচার ছাড়া মানুষ ধরছে। এই নাটক অনেক দেখেছি, আর না।
তিনি আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মূল হত্যাকারীরকে গ্রেফতার করতে না পারলে আমরা প্রবাসীরা সম্পূর্ণভাবে রেমিট্যান্স শাটডাউন করার ঘোষণা দিলাম। দিল্লির দালালি আর ৫৪ ধারায় ধর্মপ্রাণ মানুষদের ধরার জন্য, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কামানো অর্থ দেশে পাঠাই না। লাউড এন্ড ক্লিয়ার। ফুলস্টপ।
সাইফুর রহমানের এ ঘোষণার পর থেকে তার পোস্টটি আরও অনেক প্রবাসী শেয়ার করছেন এবং সংহতি জানাচ্ছেন। তামিম রেজা নামে একজন ফেসবুকে লেখেন, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে না পারলে সারা বিশ্বের সকল প্রবাসীর রেমিটেন্স শাটডাউনের ঘোষণা দেওয়া হলো।
কর্মসূচিতে যোগ দিলেন ঢামেক শক্ষার্থীরা
ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যার প্রধান আসামী ফয়সাল করিমকে হাজির ও খুনীদের বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃত্বে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে চলমান ছাত্রজনতার অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ছাত্রজনতার অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন তারা।
এসময় ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা বলেন, হাদী হত্যার বিচার চাই। স্বাধীন বাংলাদেশে এরকম আর কোনো হত্যাকা- দেখতে চাই না এবং বাংলাদেশ নিয়ে যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে। প্রধান আসামীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো প্রভাব বা চাপের কাছে ন্যায়বিচার যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। তারা বলেন, এই আন্দোলন কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে। ছাত্রসমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিল এবং থাকবে।
এর আগে ছাত্রজনতার অবস্থান কর্মসূচি একাত্মতা পোষণ করেন জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জাহিদ হাসান। তিনি বলেন, এই অবস্থান কর্মসূচিতে একমত পোষণ করছি। হাদী হত্যার খুনিদের বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে হবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রধান আসামীকে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কারা কারা জড়িত ছিল, তারও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এখনও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি হয়নি। এমন হত্যাকা- মেনে নেয়া যায় না। এদিকে হাদী হত্যার বিচার দাবি করে দেশের বিভিন্নস্থানে কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো: নির্মম হত্যাকা-ের শিকার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদীর হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শতাধিক তরুণ-যুবক নিউমার্কেট মোড়ের এক পাশে অবস্থান নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আরও লোকজন জড়ো হলে কর্মসূচি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে।
অবস্থানকারীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা ও হাদী হত্যার বিচার দাবিতে লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। ‘অবস্থান কর্মসূচি’ লেখা ব্যানার সড়কে স্থাপন করে চারপাশে বৃত্তাকারে অবস্থান নেন তারা। এ সময় ‘বিচার বিচার চাই, হাদী হত্যার বিচার চাই’, ‘সুশীলতার দিন শেষ, বিচার চাই বাংলাদেশসহ হত্যাকা-ের বিচার ও ভারতের ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে নানা স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা।
ব্যস্ততম নিউমার্কেট মোড়ে একপাশে অবস্থান কর্মসূচি চলায় সেখানে যানবাহন চলাচলে ধীরগতি সৃষ্টি হয়। এর ফলে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট দেখা দেয়।
জানা গেছে, সকাল থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন ও ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে ঢাকার শাহবাগের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামেও অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে দুপুরে নিউমার্কেট মোড়ে সর্বস্তরের মানুষকে জমায়েত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে রিকশায় থাকা অবস্থায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদীকে গুলী করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ও র্যাব কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও মূল গুলীবর্ষণকারী হিসেবে শনাক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন হাদীর অনুসারীরা।