মোঃ রফিুকুল ইসলাম (কালিগঞ্জ) সাতক্ষীরাঃ এক সময় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের মাঠে মাঠে খেসারির ডালের চাষ হতো প্রচুর পরিমাণ। আর মাঠে মাঠে সবুজ ঘাসের মতো বিছিয়ে থাকতো। খেসারীর ডাল ক্ষেতে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির আবাদ হতো। সেই সময় ডাল জাতীয় কৃষিতে খেসারি চাষে আগ্রহ ছিল কৃষকের। উর্বর ফসলি জমিতে দিগন্তজুড়ে সবুজ খেসারির নীলাভ ফুলে প্রকৃতি এক অপরূপ সাজে সেজে থাকতো। খেসারি ডাল চাষের আগ্রহ আছে কৃষকদের মাঝে, কিন্তু নেই আবাদ যোগ্য জমি। এ ডাল দিয়ে তৈরি হয় নানা রকমের খাবার। বিশেষ করে রমজান মাসে এর চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। এ বছর রমজানের পরেই কৃষকেরা তাদের খেসারি ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। ঝালকাঠি জেলার চার উপজেলার আমন আবাদি জমিতে এ বছর খেসারি ডালের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে গ্রাম-গঞ্জের সামান্য কিছু কিছু জমিতে খেসারি ডালের চাষ হয়েছে। বীজ বেড়ে ওঠার পরে শাক হিসেবেও খেসারি লতার কদর আছে সব মহলে। মৌসুমি এ শাকের জনপ্রিয়তা আছে গ্রাম-গঞ্জ এলাকায়। এক সময়ং বিস্তীর্ণ আমন চাষের জমিতে এ ডাল চাষ হতো। খেসারীর এই ডালকে গ্রাম্য ভাষায় এলাকার মানুষেরা তেবড়ের ডাল বলে।

কালিগঞ্জ উপজেলার তারালী গ্রামের কৃষক আবদার আলী সরদারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দুই যুগ আগে আমন ধান থাকা অবস্থায়ই নভেম্বর মাসে কাদাময় জমিতে বিঘা প্রতি পাঁচ-ছয় কেজি খেসারি ডালের বীজ ছিটিয়ে দিতো চাষীরা। এ পদ্ধতিকে রিলে ফসল চাষ পদ্ধতি বলা হয়। এখন খেসারীর জমিতে হচ্ছে মৎস্য ঘের আর ধানের চাষ। কিছু জমিতে খেসারী, মসুরী, সরিষাসহ বিভিন্ন জাতের ডালের চাষ হচ্ছে। তবে জমিতে লাঙ্গল দিয়ে চাষ করে ডালের বীজ বপন করে। নভেম্বর মাসে এ পদ্ধতিতে কৃষকেরা সঠিক সময়ে খেসারি বীজ বুনতে পেরেছে। বর্তমানে কিছু ছড়ায় ফুল আবার কিছু ছড়ায় ডাল ধরতে শুরু করেছে।

নভেম্বর মাসে বীজ বপন করে বর্তমানে ফুল থেকে ফসল আসতে শুরু করেছে। মার্চ মাসে খেসারি ফসল তোলা যায়। বেশিরভাগ কৃষক রিলে খেসারির জমিতে কোনো ধরনের সার প্রয়োগ করেন না। কিন্তু খেসারির বীজ বপনের সময় বিঘাপ্রতি ৬ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি এবং ৫ কেজি পটাশ সার জমিতে ছিটিয়ে দিলে ভালো ফলন নিশ্চিত হয়। সার ও বীজ ছিটানোর সময় খেয়াল রাখতে হয়, ধান গাছ যেন জমিতে দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে। শুয়ে পড়া ধান গাছের জমিতে রিলে খেসারি চাষাবাদ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে না। গাছ ভেজা থাকা অবস্থায়ও সার ছিটানো ঠিক হবে না। জমিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ডালজাতীয় ফসল উৎপাদনের পূর্বশর্ত।

কালিগঞ্জ উপজেলার মথুরেশপুর ইউনিয়নের মুকুন্দপুর গ্রামের খেসারীর ডাল চাষী মোঃ আব্দুল হামিদ জানান, আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে বিঘা প্রতি প্রায় ২০০ কেজিরও বেশি খেসারি ডাল পাবেন বলে সে আশাবাদি যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ হাজার টাকারও বেশি। বাজারে এখন ১ কেজি খেসারি ডালের মূল্য প্রায় ৮০-৯০ টাকা। অথচ ধানের জমিতে রিলে পদ্ধতিতে খেসারি ডাল চাষাবাদে বীজ, সারসহ খরচ বিঘা প্রতি মাত্র ১ হাজার টাকা খরচ হয়। শুধু তা-ই নয়, খেসারি গাছের শেকড়ে নডুউল তৈরি হয়, যা মাটিকে উর্বর করে। অর্থাৎ ডাল ফসল আবাদের কারণে জমির উর্বরতা শক্তিও বাড়ে। খেসারি ফসল তোলার পর ধান গাছের নাড়া জমিতে মিশিয়ে দিলেও জমির উর্বরতা বাড়ে। এতে জমির লবণাক্ততাও কিছুটা কমে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে ফসল ভালো হয়। এ খেসারী অর্থাৎ তেবড়ের ডাল নামে এলাকায় পরিচিত। গাছের মাথায় ফল দেখা গেলে ¯’ানীয় মানুষেরা ডাল তুলে কাঁচা খায়, আবার তেল দিয়ে ভেজে খায়। খেতে খুব মজা লাগে। আবার এ ডাল মেশিনে ভাঙ্গায়ে বেশন তৈরী করে বিভিন্ন রকম ভাজা, যেমন চপ, পেঁজি।

তেতুলিয়া গ্রামের কৃষক শ্রী দীলিপ মন্ডল দৈনিক সংগ্রামকে কৃষকেরা জানান, গত বছর প্রতি মণ খেসারি বিক্রি হয়েছে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। এ বছর আরও দাম বাড়বে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। খেসারি চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। এ ছাড়া শাক হিসেবে এর চাহিদা থাকায় অতিরিক্ত লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। গো-খাদ্য হিসেবেও শুকনা খেসারি লতার জুড়ি নেই। কালিগঞ্জ কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়,‘এ উপজেলায় আগের মতো তেবড়ে অর্থাৎ খেসারী ডালের চাষ হয় না। কারণ একটাই আবাদ যোগ্য তেমন নেই। উপজেলাতে সামন্য কিছু জমিতে তেবড়ে ডালের চাষ হয়েছে। ফুল থেকে ফসল আসতে শুরু করেছে। দেখেই বোঝা যায়, ফলনও খুব ভালো হবে। এ জন্য লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারন করা হয়নি। র্কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের সব ধরনের ডাল জাতীয় ফসলের জন্য সহযোগিতা করা হচ্ছে।’