খুলনায় গম চাষের সোনালি দিন এখন স্মৃতির পাতায়। জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক চাপে কৃষকরা ধীরে ধীরে গম চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। বেছে নিচ্ছেন লাভজনক বিকল্প ফসল। অথচ একসময় খুলনায় শীত মওসুমে চাষিদের অন্যতম ভরসা ছিল গম চাষ। জমির উৎপাদনশীলতা ও চাহিদার কারণে কৃষকরা গমকে বেছে নিতেন। তবে বর্তমানে লাভজনক না হওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে গম চাষ বিলুপ্তির পথে। কৃষকরা বলছেন সময়মতো উদ্যোগ না নিলে এ অঞ্চলে গম চাষ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি ২০২৫-২০২৬ মওসুমে খুলনায় গমের আবাদ লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে মাত্র ২৪৮ হেক্টর জমিতে। যেখানে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৭৯৬ মেট্রিকটন। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৩.২১ মেট্রিকটন। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গমের আবাদ হয়েছে পাইকগাছায় ৪২ হেক্টর, ডুমুরিয়া ২৪ হেক্টর ও রূপসায় ১৮ হেক্টর।
গেল ১০ বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই গমের আবাদ কমেছে। ২০১৫-২০১৬ রবি মওসুমে আবাদ হয়েছে ৬৯০ হেক্টর জমিতে। ২০১৭-২০১৮ তে আবাদ কমে ১৯২ হেক্টরে দাঁড়ায়। সেখান থেকে ২০২০-২০২১ মওসুমে এসে আবাদ হয় ২২১ হেক্টরে। গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম আবাদ হয় গত বছর, মাত্র ১৩২ হেক্টর। গমের আবাদ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত আমাদের দেশে গম চাষের উপযুক্ত সময় নভেম্বর মাসের ১৫ তারিখ থেকে ডিসেম্বর মাসের ৭ তারিখ। এসময় আমন ধান কাটার পর জমিতে যে জো আসে অর্থাৎ যেটা গম চাষের জন্য উপযোগী সেটা আসতে দেরি হয়। ফলে দেরিতে গম আবাদের কারণে গমের ফলন কম হয়। এ ছাড়া গমের বীজ বাহিত ব্লাস্ট রোগের কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
উৎপাদিত গমের বীজেরও এই রোগ থেকে যায়, যার ব্যবস্থাপনা কৃষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলন কম হওয়া, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরার প্রভাব, লবণাক্ততার কারণে গমের ফলন কমে যাওয়া, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রণোদনা না থাকা, উচ্চ ফলনশীল ধান ও ভুট্টার কারণে গম চাষে আগ্রহ হারানোকে আবাদ কমে যাওয়ার কারণ বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ায় কৃষকরা রবি মওসুমে লাভজনক সবজি আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
পাইকগাছায় তিন বিঘা জমিতে গম আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আবুল কালাম। তিনি বলেন, গম চাষে উৎপাদন খরচ বেশি, লাভ কম। মাছ ও সবজি চাষে লাভ বেশি। তবুও কিছু জমিতে গমের আবাদ করছি। আগামীতে হয়তো গমের আবাদ নাও করতে পারি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গম চাষ টিকিয়ে রাখতে লবণাক্ত সহনশীল জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজন। কৃষকদের সহায়তা ও প্রণোদনা দিলে আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। গবেষণা ও প্রযুক্তি সহায়তা ছাড়া গম চাষ টিকে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে আশার দিক হচ্ছে, বিডব্লিউএমআরআই-৪ নামে গমের নতুন একটি জাত এসেছে যা তাপ সহনশীল ও মরিচা রোগ প্রতিরোধী। এর গড় ফলন সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ টন। এ ব্যাপারে খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুস সামাদ বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় খুলনায় গমের আবাদ কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে দেরিতে জো আসা এর অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে কৃষকরা গম চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। লাভজনক বিকল্প ফসল উৎপাদনে মনোযোগী হচ্ছেন তারা।