রেজাউল করিম রাসেল কুমিল্লা অফিস : কুমিল্লায় আমন ধান কাটার মৌসুমে মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ছত্রাকজনিত রোগ ‘ফলস স্মাট’। এ রোগে ধানের স্বাভাবিক শস্যদানা পরিণত হচ্ছে হলদেটে-জলপাই রঙের গুটিতে। ফলে পুরোপুরি পাকার আগেই কৃষকরা তড়িঘড়ি করে কাঁচাপাকা ধান ঘরে তুলতে বাধ্য হচ্ছেন। সময়ের আগেই ধান কাটায় কমছে ফলন, বাড়ছে উৎপাদন ঝুঁকি। কুমিল্লার জেলার লালমাই, সদর দক্ষিণ, বরুড়া ও সদরসহ জেলার আমন ফসলের জমিতে একই চিত্র দেখা গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুম ভাল থাকা সত্ত্বেও রোগবালাই আর পোকার আক্রমণে ফলনের পাল্লা ছোট হয়ে আসছে। প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাজরা পোকা, ফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকা এবং ফলস স্মাট দমনে সময়মতো কার্যকর পরামর্শ মেলেনি। এদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভুল পরামর্শে বেনামি কোম্পানির অকার্যকর ওষুধ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তারা। কৃষকদের দাবি, ফলস স্মাটের আগে ধানের শীষ যখন বের হচ্ছে তখন ছিল মাজরা পোকার আক্রমণ। এ পোকা ধানের গোড়া দিয়ে কাটা ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে শীষ। পোকামাকড় ও রোগবালাই আক্রমণের এ ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ধান কাটা-মাড়াই শেষে স্পষ্ট হবে বলে মনে করেন কৃষকরা।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় ৪৬,৮০৩ হেক্টর বেশি জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। তবে আবাদ বেড়েছে প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টর, কিন্তু ফলনের লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ১,৪০৭ মেট্রিক টন।

লালমাই কাচি এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক জানান, সারা বছর পরিশ্রম করি এই ধানটাই ঘরে তোলার জন্য। কিন্তু পাকার মুখে ফলস স্মাট দেখে বুকটা হুহু করে উঠে। কাঁচাপাকা ধান কাটছি লক্ষীর গু আতঙ্কে। কারণ মাঠে ধান থাকলেই রোগের আক্রমণ বাড়ছে। তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করে ধান কেটে ফেলায় উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে না। এ শঙ্কা ছাড়াও খরচের চাপ, ঋণের বোঝা সব মিলিয়ে এখন রাতেও ঘুম আসে না।

বরুড়ার কৃষক আমিনুল হক বলেন, মাঠে দাঁড়ানো ধান দেখে ভেবেছিলাম এবার একটু ঘুরে দাঁড়াবো। কিন্তু ফলস স্মাট পুরো স্বপ্নটাই নষ্ট করে দিল। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে গেছি, কিন্তু যে ওষুধ দিয়েছে তার কোন কাজই হলো না। এত কষ্ট করে ফসল করেও যদি এভাবে রোগে নষ্ট হয়, তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে?

লালমাইয়ের আরেক কৃষক মোতালেব মিয়া বলেন, ধান পেকে উঠলেই আনন্দ হওয়ার কথা, আর এখন সেটা ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটা গুচ্ছ ধরে দেখি, কতটা দানা কালো হয়ে গেছে।

ব্রি ধান ৪৯সহ কয়েকটি পুরনো জাতের ধানে ফলস স্মাট শনাক্তের কথা স্বীকার করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের মতে, মানসম্মত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ, বীজ শোধন ও জমির সঠিক পরিচর্যা করলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে কুমিল্লার লালমাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লায়লা আরজুমান বেগম বলেন, ফলস স্মাট দমনে সঠিক বীজ শোধন, মানসম্মত ছত্রাকনাশক এবং জমির সঠিক পরিচর্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা অনেক সময় যাচাইবাছাই না করেই কমদামি বা অকার্যকর ওষুধ ব্যবহার করেন। এতে লাভের বদলে আরও ক্ষতি হয়।

তিনি আরও বলেন, কৃষক সব সময় মনে করেন বাড়তি সার ব্যবহার করলেই ফসলের উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু জমির যে খাদ্য বা জমির যে শক্তির প্রয়োজন সেজন্য জৈব সারের ব্যবহারও যে প্রয়োজন সেটি তাদেরকে বুঝিও ফলপ্রসূ কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না।