হাটহাজারী চট্টগ্রাম সংবাদদাতা : বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার কথা বললেই সবার আগে যে শব্দটি উঠে আসে, তা হলো-ধান। ভাতনির্ভর এ দেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে ধান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের কারণে ধান চাষ এখন আর সহজ নয়। এই কঠিন বাস্তবতায় কৃষকের ভরসার নাম বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং এর উচ্চ ফলনশীল ধানের জাতসমূহের উদ্ভাবন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কৃষকদের জন্য সেই ভরসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ব্রি-র ‘নতুন ছয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন’ শীর্ষক (এলএসটিডি) প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, চট্টগ্রাম।
ব্রি-র ধারাবাহিক গবেষণা ও উদ্ভাবনই আজ বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার শক্ত ভিত গড়ে তুলেছে। আর গবেষণা ও নতুন নতুন ধানের জাত/প্রযুক্তি উদ্ভাবন, সম্প্রসারণ এবং ধানের মোট উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে ব্রি-র পূর্বের ১১ টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে “এলএসটিডি” প্রকল্পের আরোও ৬ টি আঞ্চলিক কার্যালয় ও ৬ টি স্যাটেলাইট স্টেশন যার মাধ্যমে স্থানভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে গবেষণার সুফল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে কৃষকের হাতে।
এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা উল্লেখযোগ্য স্যাটেলাইট স্টেশনগুলোর একটি হলো ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, চট্টগ্রাম স্থাপনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে আধুনিক কৃষি গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এই স্যাটেলাইট স্টেশনটি চট্টগ্রাম জেলার মোট ১৫টি উপজেলায় ধানভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্টেশনটির মূল লক্ষ্য হলো চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য উপযোগী ধান উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ। এছাড়া এ স্টেশনটি যে ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করে তা হলো- ১। অনুকূল পরিবেশ উপযোগী ও চিকন ধানের জাত পরীক্ষণ ও চাষাবাদের আধুনিক কলাকৌশল সম্প্রসারণ, ২। ধানের সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগ ধানের ব্লাস্ট, টুংরো, পাতাপোড়া, খোলপোড়া দমনে/প্রতিরোধে প্রযুক্তি উদ্ভাবন/উন্নয়ন ও কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ, ৩। ধানের মাজরা, বাদামী গাছ ফড়িং, সবুজ পাতা ফড়িংসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা দমন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবন/উন্নয়ন ও কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ, ৪। বোরো মওসুমে লবনাক্ততা সহনশীল ধানের জাতের উপযোগিতা যাচাই ও সম্প্রসারণ, ৫। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের মাধ্যমে ব্রি উদ্ভাবিত নতুন ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ও প্রযুক্তির কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ, ৬। ধান চাষে কৃষি যান্ত্রিকীকরনের উপযোগিতা পরীক্ষণ, মূল্যায়ন ও কৃষকদের অংশগ্রহন, ৭। ব্রি-র বিভিন্ন গবেষণা বিভাগের আঞ্চলিক গবেষণা কার্যক্রম যেমন, ধানের জাত, শস্য বিন্যাস, সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি তাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা, ধান চাষাবাদ বিভিন্ন প্রযুক্তির এবং খামার যন্ত্রপাতির স্থানীয় অভিযোজন, বাস্তবায়নে কারিগরি ও অন্যান্য বিবিধ সহায়তা প্রদান করা।
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রামের প্রকল্পের শুরু (জুলাই ২০২৩) থেকে আজ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৫ টি উপজেলায় ধানের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে আউশ মওসুমে ব্রি ধান৯৮ এর ২০ টি, আমন মওসুমে ব্রি ধান৯৫, ব্রি ধান১০৩ এর মোট ১২০টি এবং বোরো মওসুমে ব্রি ধান১০২, ব্রি ধান১০৭ ও ব্রি ধান১০৮ এর মোট ৯৫ টি সর্বমোট ২৩৫ টি এক একরের কৃষক পর্যায়ে প্রায়োগিক পরীক্ষণ ট্রায়াল স্থাপন করা হয়। এসব ট্রায়ালে থেকে প্রায় ৫৭০ টন ধান উৎপাদন হয় এবং প্রায় ৫০ টনের উপর বীজ ধান কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ করে তা বিতরণ করা হয় যা চট্টগ্রাম অঞ্চলের জাত জনপ্রিয়করণ ও খাদ্য নিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।