নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-সহ পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানতকারীরা তাদের নিজস্ব জমা অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শাখায় গত টানা ১৩ দিন ধরে এই সংকট চলমান থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, লাখ লাখ টাকা জমা থাকলেও গ্রাহকদের পাঁচ হাজার টাকার চেক পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এমটিএম ও এটিএম কার্ড কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যাংকের মুনাফা তো দূরের কথা, মূল আমানত তুলতেও পারছেন না গ্রাহকেরা।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি একই ধরনের সংকটে রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক পিএলসি এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ব্যাংকের শাখায় একই চিত্র দেখা গেছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ডিপিএস ও এফডির অর্থও আটকে : গ্রাহকদের অভিযোগ, ডিসেম্বর মাসে যেসব ডিপিএস ও ফিক্সড ডিপোজিট মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলোর অর্থ এখনো অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। এমনকি প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক মুনাফা স্কিমের টাকাও হোল্ড হয়ে রয়েছে। এতে বহু পরিবার দৈনন্দিন খরচ চালাতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েছে।

শাখা পরিবর্তনে চরম ভোগান্তি : সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এক শাখার অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য শাখায় টাকা তোলা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে অ্যাকাউন্ট থাকা কোনো গ্রাহক ঢাকায় অবস্থান করলে সামান্য অর্থ তুলতেও তাকে আবার চট্টগ্রামে আসতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়ছে।

জানা গেছে, এই সংকট শুধু ডিপোজিট হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট, বেতন অ্যাকাউন্ট, এনআরবি/প্রবাসী অ্যাকাউন্ট, জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট এবং এটিএম সেবাসহ প্রায় সব ব্যাংকিং কার্যক্রমই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

নভেম্বরের পর জমা হওয়া অর্থে নিষেধাজ্ঞা : সূত্র জানায়, গত ৪ নভেম্বরের আগে যেসব অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা হয়েছিল, সেগুলোর একটি অংশ তুলতে পারছেন গ্রাহকেরা। তবে ওই তারিখের পর প্রফিট বা ডিপোজিট পাওয়া গ্রাহকদের কাউকেই টাকা দেওয়া হচ্ছে না।

প্রবাসী ও অসুস্থ গ্রাহকদের করুণ অবস্থা : নিউজিল্যান্ড প্রবাসী এহসানুল করিম জানান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে তার প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা জমা থাকলেও দেশে ফিরে এক হাজার টাকাও তুলতে পারেননি। কানাডা প্রবাসী মনময়ী হাসান বলেন, বাবার চিকিৎসার জন্য মাসিক মুনাফা স্কিমে রাখা ১২ লাখ টাকার মুনাফা তুলতে না পারায় ওষুধ কেনা নিয়ে সংকটে পড়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপিকা বলেন, ডিপিএস মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও টাকা না পেয়ে ছেলের টিউশন ফি দিতে বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বেবী চৌধুরি তার ১২ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙাতে না পেরে ভারতের চিকিৎসা যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রবাসীদের জন্য কঠোর শর্ত : বিদেশে অবস্থানরত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের সরাসরি উপস্থিতি ও ভোটার আইডি কার্ড ছাড়া কাউকে টাকা তুলতে দিচ্ছে না। এতে বহু প্রবাসী, প্রবীণ ও পেনশনভোগী গ্রাহক চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবতা : উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, সাধারণ গ্রাহকদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে এবং যেকোনো সময় উত্তোলনযোগ্য হবে। তবে বাস্তবে সেই নির্দেশনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

আন্দোলনের ডাক : ১৩ জানুয়ারি ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একটি ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হলে আজ ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কাফনের কাপড় বেঁধে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। এক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় এক হাজার গ্রাহক এতে সমর্থন জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী এসোসিয়েশন মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের ঘোষণাও দিয়েছে।

ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য : গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার ম্যানেজার এহসান হক বলেন, “৪ নভেম্বরের আগে যেসব অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়েছে, শুধু সেগুলো থেকেই সীমিত পরিসরে অর্থ দেওয়া হচ্ছে।” মাসিক মুনাফা স্কিমের অর্থ না দেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা তারা পাননি।

বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. মকবুল হোসেন বলেন, “দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে দেখভাল করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আঞ্চলিক কার্যালয়ের কিছু করার নেই।”