বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এই উত্তরণ দেশের জন্য গর্বের হলেও, এর ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারেএমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা।

তাঁরা বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ধীরে ধীরে কমে যাবে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা, বাড়বে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, সংকুচিত হবে রপ্তানি মুনাফা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু এসব পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুুতি এখনো যথেষ্ট নয়।

এই প্রেক্ষাপটে তাঁরা একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকারদের দক্ষতা উন্নয়ন, জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বৈচিত্র্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দেন।

এই মতামতগুলো উঠে আসে Implications of LDC Graduation for Banking Industry: Bangladesh Perspective শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায়। আলোচনা সভাটির আয়োজন করে International Chamber of Commerce Bangladesh (আইসিসি বাংলাদেশ) সহযোগিতায় ছিল বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। রাজধানীর একটি হোটেলে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন Bangladesh Bank এর গভর্নর Dr. Ahsan H. Mansur । সভাপতিত্ব করেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি Mahbubur Rahman।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। আইসিসি বাংলাদেশ ব্যাংকিং কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ. (রুমি) আলী স্বাগত বক্তব্য দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, “এলডিসি উত্তরণ হবেই এটা আজ না কাল। প্রশ্ন হলো আমরা কতটা প্রস্তুুত।” তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণকে আলাদা কোনো নীতিগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো, বন্দর, সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আইসিটি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, সহজ ঋণ এবং নীতিগত ছাড় হারাবে। এতে বিশেষ করে আর্থিক খাতে নতুন চাপ তৈরি হবে। তিনি বলেন, “এলডিসি উত্তরণ শুধু উদযাপনের বিষয় নয় এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। এই সময়ে একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকই হবে আর্থিক স্থিতিশীলতার মূল ভরকেন্দ্র।”

মুহাম্মদ এ. (রুমি) আলী বলেন, ব্যাংকিং খাতে এলডিসি উত্তরণের ঝুঁকি নিয়ে এখনো যথেষ্ট আগাম আলোচনা ও প্রস্তুুতি দেখা যাচ্ছে না। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণ উন্নয়নের শেষ নয়, বরং নতুন অধ্যায়ের শুরু। প্রাইম ব্যাংকের এমডি হাসান ও. রশীদ বলেন, এর প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়বে, কারণ অনেক ব্যাংক তালিকাভুক্ত।

ফ্যাশনসের এমডি ফজলুল হক বলেন, ২০২৬ সালের নভেম্বরের জন্য দেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এবং স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুবই জরুরি।

সিমিন রহমান বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ শুধু দেশের অর্থনৈতিক শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি এমন একটি বড় পরিবর্তন, যা নীতিনির্ধারণের সুযোগ ও প্রতিযোগিতার ধরন বদলে দেবে বিশেষ করে মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাতগুলোতে। তিনি বলেন, ওষুধ খাত জনস্বাস্থ্য ও শিল্প সক্ষমতার মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। তাই এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে দেশে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই)এর স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পিকার্ড বাংলাদেশের ডিএমডি আমৃতা মাকিন ইসলাম বলেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৈচিত্র আনা জরুরি।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইএফসি, বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।