ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এবং জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশে এর বহুমুখী প্রভাব অনুভূত হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে ইরান অভিমুখে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও তাদের প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে তেহরানে এই ভয়াবহ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এই আকস্মিক ও বড় ধরনের সামরিক আঘাতের পর ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। ইসরায়েলের বাইরে ওই অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতেও তেহরান প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
চলমান এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে। উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই রুট দিয়ে হয়ে থাকে। যুদ্ধের কারণে এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী শ্রমিকের একটি বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন ও কর্মসংস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে দেশে থাকা তাদের স্বজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করতে হলে বাংলাদেশকে এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে বিদেশ নির্ভরতা কম। পররাষ্ট্র বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বড় করণীয় হলো কোনো একটি দেশের উপর নির্ভর না হয়ে নিজের অর্থনীতি গড়ে তোলা। একসময় আমরা সাহায্য নির্ভরতা কমিয়ে দুই শতাংশে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু পরে আমরা বাণিজ্য নির্ভরতায় চলে গিয়েছি। ডাইভার্সিফিকেশন দরকার। শুধু একটি বা দুটি পণ্য নয়, ১০-১২টি পণ্যের জন্য যথাযথ মানবসম্পদ ব্যবহার করতে পারলে চিন্তা নেই।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ইরানের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে বাইরের বল প্রয়োগে যে পরিবর্তন আসে, তা টেকসই হয় না। ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সরিয়ে শাহকে এনেছিল। তার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লব সংঘটিত হয়।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে তার অস্ত্র-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হতে হবে। তা না হলে পশ্চিমাদের অন্যায় যুদ্ধের চাপ বিশ্বকে মুক্তি দেবে না। হুমায়ুন কবির বলেন, প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের নিরাপদে সরিয়ে আনতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের নতুন চাপের কাহিনি আবার সামনে এসেছে। এই চাপ মোকাবিলা করতে পারে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সচেতন জনগণ, যা বড়ভাবে নির্ভর করবে তাদের প্রতিক্রিয়ার ওপর।