১২ হাজার কোটি টাকার দেশীয় সুতা অবিক্রিত
৫০টি কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান হারিয়েছে ২ লাখ শ্রমিক
চরম দুঃসময় পার করছে দেশের টেক্সটাইল শিল্প। প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। উচ্চ মূল্য পরিশোধের পরও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়ার পাশাপাশি ভারত থেকে সুতা আমদানি সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। তুলনামূলক সস্তায় ভারতীয় সুতার অবাধ প্রবেশে বিপাকে পড়েছেন দেশের টেক্সটাইল শিল্প উদ্যোক্তারা।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমেছে। প্রায় ৫০টি কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে। কর্ম হারিয়েছে প্রায় ২ লাখ শ্রমিক। একই সাথে গুদামগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রিত পড়ে থাকায় বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পেতে ৭২ ঘন্টার মধ্যে নীতি সহায়তা চেয়েছে বিটিএম এ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও স্পিনিং শিল্প বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের উৎপাদন করে এবং রফতানি খাতের ৮০ শতাংশ সাপ্লাই চেইনে এই খাত পরোক্ষভাবে যুক্ত। তাই এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু কারখানা মালিক নয়, ব্যাংক, বীমা, পরিবহন, শ্রমবাজারসহ পুরো অর্থনীতি তার প্রভাব টের পাবে।
টেক্সটাইলে মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল রোববার জানান, ভারত থেকে কম দামে সুতা আমদানি হওয়ায় দেশীয় সুতার কল (স্পিনিং মিল) বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। গত অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ। মূলত ভারতের ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি সুতায় ৩০ সেন্ট কম দামে ডাম্পিং করছে বাংলাদেশে। সে কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি সুতাকল বন্ধ হয়ে গেছে। এসব মিলে ৫০০-৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ ছিল। নতুন করে এসব সুতাকল চালু করা কঠিন।
বিটিএমএর সভাপতি আরও বলেন, আমরা সুতার জন্য ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। অতীতে একাধিকবার ভারত বিনা কারণে তুলা রপ্তানি বন্ধ করেছে। সুতা রপ্তানিও বন্ধ করেছে।’ এই অতিনির্ভরতা ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনবে বলে তাঁর শঙ্কা। এই খাতকে বাঁচাতে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্ত চেয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যে দেখা যায়, গত তিন বছর ভারত তাদের টেক্সটাইল শিল্পে রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নগদ প্রণোদনা, কর ছাড়, স্বল্পসুদে ঋণ এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসে ভর্তুকি দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় মিলগুলো প্রতি কেজি সুতায় ২০ থেকে ২৫ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে গত দুই বছরে নগদ প্রণোদনা ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এতে টেক্সটাইল মিলগুলো রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু রফতানি নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারেও ভারতীয় সুতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যে দেখা যায়, স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ৩০ কাউন্ট সুতা বিক্রি হচ্ছে ২ দশমিক ৪৫ ডলার থেকে ৩ দশমিক ০৫ মার্কিন ডলার দামে। কিন্তু ভারতীয় সুতা চট্টগ্রাম বন্দরে ‘সিঅ্যান্ডএফ’ হিসেবে আমদানি করা যাচ্ছে প্রায় দুই দশমিক ১৯ ডলারে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ সেন্ট সাশ্রয় হওয়ায় পোশাক প্রস্তুতকারকেরা দেশীয় সুতার পরিবর্তে ভারতীয় সুতার প্রতি বেশি ঝুঁকছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও চোরাই পথে আমদানি হওয়া সুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে দেদার। ৩২ শতাংশ ওয়েস্টেজ অনুমোদনের সুযোগে বিপুল পরিমাণ সুতা অবৈধভাবে বাজারে ঢুকছে। তারা বলছেন, ১২ বিলিয়ন ডলারের দেশীয় পোশাক বাজারের মধ্যে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সুতা ও ফেব্রিকস অবৈধভাবে বিক্রি হয়, যা স্থানীয় মিলগুলোর চাহিদা কমার অন্যতম কারণ।
আইইবি’র ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ বলেন, স্পিনিং সেক্টরের বড় সমস্যা হচ্ছে ভারতীয় সুতা এবং গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি। মালিকেরা চান ভারতীয় সুতা দেশে প্রবেশ বন্ধ হোক, কিন্তু গার্মেন্টস মালিকেরা বিপরীত মত দেন। তাই এই দ্বন্দ্ব নিরসনে সব সেক্টরের প্রতিনিধি নিয়ে বসতে হবে।”
আরমাডা স্পিনিং মিলস লিমিটেডের পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশ্বে শিল্পবিপ্লব ঘটেছে প্রযুক্তি ও নীতির সমন্বয়ে। অথচ বাংলাদেশে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি। ভারত বিনা সুল্কে সুতা রপ্তানি করে আমাদের বাজার দখল করছে। উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করে তারা ডাম্পিং করছে- এটি বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি।”
ওয়ান কম্পোজিট লিমিটেডের পরিচালক প্রকৌশলী নাসিরুদ্দিন মিয়া জানান, আমরা এখন এক ডলার বিশ সেন্টে শার্ট বিক্রি করছি, কিন্তু উৎপাদন খরচই ১ ডলার ৫৫ সেন্ট। এই ব্যবধান টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সরকারকে দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ইনসেন্টিভ পুনরায় চালু করতে হবে।
রাহ স্পিনিং মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আহসানুল রাসেল বলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্থিরতা স্পিনিং সেক্টরের সবচেয়ে বড় বাধা। প্রডাকশন চলাকালীন বিদ্যুৎ চলে গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। সরকার যদি ইউটিলিটি সমস্যা সমাধান করে, খরচ অনেক কমে আসবে।”
নারায়ণগঞ্জের শাহ ফতেহউল্লাহ টেক্সটাইল মিলসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদ আলম জানান, তাদের গুদামগুলো অবিক্রিত সুতায় ভর্তি হয়ে গেছে। এমনকি কারখানার ভেতরে জায়গা বানিয়ে তারা সেগুলো রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। বিক্রি না হওয়ায় ইতোমধ্যে তারা ২৫ হাজার স্পিন্ডল বন্ধ করেছেন। আরো ২৫ হাজার বন্ধের প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।
লিটল স্টার স্পিনিং মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ১০ শতাংশ স্টক থাকে, এখন তা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অবিক্রীত সুতা জমে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে বলে তিনি জানান।
বিটিএমএর তথ্যানুযায়ী, দেশের ৫১৯টি স্পিনিং মিল রয়েছে। এসব স্পিনিং মিল নিট কাপড়ের ৮৫-৯০ শতাংশ এবং ওভেন কাপড়ের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতা সরবরাহ করে থাকে। তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়লে তুলা ও সুতা দুটির আমদানিই বাড়ে। গত বছরও তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে। এ সময়ে তুলা আমদানি বাড়লেও পরিমাণের দিক থেকে তা ২০২১ সালের চেয়ে এক লাখ টন কম। অন্যদিকে গত বছর যে পরিমাণ সুতা আমদানি হয়েছে, তা ২০২১ সালের তুলনায় ১ লাখ ৪১ হাজার টন বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা গত বছর ১৮ লাখ ৮৯ হাজার টন তুলা আমদানি করে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। এতে ব্যয় হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া সুতা আমদানি হয় ১২ লাখ টন। এতে ব্যয় হয়েছে ৪৫ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, দেশি সুতা ব্যবহার বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরে নগদ সহায়তা দিয়ে আসছে সরকার। তবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অংশ হিসেবে গত বছর দুই দফায় নগদ সহায়তা কমায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার।
গত জুলাইয়ের আগে দেশি সুতা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাক নতুন বাজারে রপ্তানি করলে একটি কারখানা সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশ নগদ সহায়তা পেত। এখন সেটি কমে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে দেশি সুতা ব্যবহারে প্রণোদনা মাত্র দেড় শতাংশ। ভারতীয় ডাম্পিং নীতির কারণে আজ এই সেক্টর হুমকির মুখে। গ্যাসের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, এখনই বিকল্প শক্তি যেমন সৌরবিদ্যুতের দিকে নজর দিতে হবে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, টেক্সটাইল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বন্ডের অপব্যবহার ও অবৈধ সুতা আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম স্থিতিশীল করা ও শিল্পবান্ধব ট্যারিফ নির্ধারণ। ভারত চীনসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সাথে ‘অ্যান্টি ডাম্পিং’ শুল্ক বিবেচনা করতে হবে। প্রযুক্তি আধুনিকায়নে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
বিটিএমএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে সুতার প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি রপ্তানিতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদান। এ ছাড়া রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়ানো ও সুদহার কমানো, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো, ঋণ পরিশোধে গ্রেস পিরিয়ড দেয়ার দাবি জানানো হয়।