বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশে একের পর এক সংকটের কারণে এবারও কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা। কাঁচামালের সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় ও দীর্ঘদিনের শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই রপ্তানি খাত কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
বিদ্যুৎ সংকট, রাসায়নিকের মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি প্রণোদনা না পাওয়া, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিইটিপি না থাকা এবং চীনা ক্রেতাদের দামের সিন্ডিকেট সব মিলিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী এই শিল্প।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে পরিচিত চামড়া শিল্প থেকে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে। জাতীয় অর্থনীতিতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, নানা সমস্যায় ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এই শিল্প।
পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) অকার্যকারিতা, অর্থায়ন সংকট ও নীতিগত দুর্বলতায় শিল্পটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে।
ট্যানারি মালিকরা বলছে, কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট প্রক্রিয়াজাত চামড়া ২ থেকে আড়াই ডলারে বিক্রি হতো। এখন সেই একই চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ সেন্টে। ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ না থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাভারের হেমায়েতপুরে থাকা ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র একটি কারখানার এই সনদ রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। যদিও প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে, বিশ্লেষকদের মতে সম্ভাবনার তুলনায় তা অত্যন্ত কম।
মালিকদের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ সিইটিপি চালু না হওয়া এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। এতে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা আগ্রহ হারালেও চীনের কিছু ব্যবসায়ী কম দামে চামড়া কিনে নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, আগে ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বাংলাদেশের বড় ক্রেতা। এখন চীন ছাড়া বড় বাজার নেই। অথচ চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে কম দামে চামড়া কিনে এলডব্লিউজি সনদের সুবিধা নিয়ে বেশি দামে ইউরোপ-আমেরিকায় বিক্রি করছে। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবিএস ট্যানারির ওয়েট ব্লু কন্টাক্টর আব্দুর রহিম জানান, চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে ড্রামের ভেতরের চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তাই ঈদের পর অন্তত কয়েক মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান তারা।
বিডার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য রপ্তানি আয় হারাচ্ছে। বর্তমানে দেশের মাত্র চারটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে, যার কোনোটিই সাভার শিল্পনগরীর ভেতরে নয়।
রাসায়নিক সংকটও ট্যানারি মালিকদের নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সালফিউরিক এসিডের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আগে যে এসিড ৩৫ টাকা কেজিতে পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ২৩৫ থেকে ২৫০ টাকা দরে। অথচ এই রাসায়নিক ছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়।
এদিকে চামড়া খাতে ঘোষিত ২০০ কোটি টাকার সরকারি প্রণোদনাও এখনও পাননি মালিকরা। ব্যাংকগুলোও সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। এবিএস ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাম হোসেন বলেন, আর্থিক সহায়তা ছাড়া চামড়া কেনা সম্ভব নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে চললেও ব্যাংকগুলো সহযোগিতা করছে না।