যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থবাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। যুদ্ধের এক মাস পার হলেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমেনি।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ ) তেলের দাম রেকর্ড মাসিক বৃদ্ধির পথে থাকলেও এশিয়ার শেয়ারবাজার ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় পতনের দিকে এগোচ্ছে। ফলে বাজারে ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা বেড়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন জানিয়েছে রয়টার্স।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খোলা না থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখন শুধু সংবাদভিত্তিক ওঠানামা করছে না, বরং ভয়ভিত্তিক প্রতিক্রিয়ায় চলে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
এই খবরে যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচার যথাক্রমে ০.৩৪ শতাংশ ও ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপেও সামান্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রড ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ১১৪.৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। মার্চ মাসে এর মোট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআিই) তেল ১.৮ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৭৩ ডলারে উঠেছে এবং মাসজুড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে—গত প্রায় ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়।
একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বাব এল-মানদেব প্রণালিতেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে দ্বিমুখী সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার লেনদেন শুরুর পরপরই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ার সূচক কোসপি ৩.৮২ শতাংশ বা ২০০ পয়েন্টের বেশি কমে গিয়ে ৫,০৭৫.৯২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। জাপানের নিক্কেই সূচকও লেনদেনের শুরুতে ২.২৪ শতাংশ কমে যায়, তবে পরে সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও তা ৩.৭৭ পয়েন্ট বা ০.৭৩ শতাংশ ঘাটতিতে ছিল।
চীনের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ‘এফটিএসই চায়না এ৫০’ সূচকে সামান্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক এ মাসে প্রায় ১২.৬ শতাংশ কমার পথে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ১৭ শতাংশের বেশি পতনের দিকে— যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের (জাপান ছাড়া) শেয়ার সূচকও ১২ শতাংশের বেশি কমেছে, যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় পতন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা বন্ড বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যার বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
আমেরিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) এই বছর সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যেখানে ধারণা করা হয়েছিল যে সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্টের মতো কমানো হতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল গতকাল সোমবার জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর কী প্রভাব পড়ে তা পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি মার্চ মাসে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড এই মাসে ৪০ বেসিস পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। একইভাবে ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ডও গত ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ পরিমাণে বেড়েছে।
যুদ্ধের অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মার্কিন ডলারের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করছেন। ফলে গত জুলাইয়ের পর এই মার্চ মাসেই ডলারের মান সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের সূচক চলতি মাসে প্রায় ২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিপরীতে অন্যান্য প্রধান মুদ্রার মান নিম্নমুখী। ডলারে বিপরীতে ইউরোর মান এই মাসে প্রায় ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১.১৪৭৪ ডলারে। ব্রিটিশ স্টার্লিং পাউন্ডের মানও মার্চ মাসে ২ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। আর জাপানি ইয়েন প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৬০-এর কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা অত্যন্ত দুর্বল একটি অবস্থান।
মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে স্বর্ণের দাম আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ০.৬ শতাংশ বেড়ে ৪,৫৩৮.০৭ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।