যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা ও দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় থাকার প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চাপ তৈরি করেছে।
সোমবার (৪ মে) আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫২৩ দশমিক ২৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ফিউচার বাজারেও দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৩০ ডলারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। টিডি সিকিউরিটিজের গ্লোবাল হেড অব কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি বার্ট মেলেক বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। বরং এতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
চার সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমেনি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এ সময় ইরান হরমুজ প্রণালিতে একাধিক জাহাজে হামলার পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি তেল বন্দরে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার আরও শক্তিশালী হয়েছে। পাশাপাশি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের মূল্য বাড়লে অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে স্বর্ণের দাম তুলনামূলক বেশি হয়ে যায়, ফলে স্বর্ণের চাহিদা কমে পড়ে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে পারে বলে ধারণা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছর মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কোনো নীতি শিথিল করবে না; এমন ধারণা দিচ্ছে এমন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নতুন করে যোগ হয়েছে বার্কলেস। গত সপ্তাহে উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাবে অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ফেড সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে, যা ১৯৯২ সালের পর সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির সুযোগ, এডিপি কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এবং এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে, যা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণ সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। তবে উচ্চ সুদের হারের পরিবেশে এটি আকর্ষণ হারায়, কারণ এতে সরাসরি কোনো মুনাফা পাওয়া যায় না।
বার্ট মেলেক মনে করেন, স্বর্ণের জন্য চার হাজার ২০০ ডলারের আশপাশে একটি শক্তিশালী সাপোর্ট রয়েছে। তবে অনিশ্চয়তা এবং সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনার কারণে স্বল্পমেয়াদে অনেক বিনিয়োগকারী তাদের অবস্থান থেকে সরে যেতে পারেন।
অন্যান্য ধাতুর বাজারেও দরপতন দেখা গেছে। স্পট সিলভারের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭২ দশমিক ৯৫ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯৫৫ দশমিক ৯৫ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১ হাজার ৪৮১ দশমিক ০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ববাজারে দাম কমায় দেশের বাজারেও কমতে পারে স্বর্ণ ও রুপার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম কমলে এর প্রভাব পড়ে দেশের বাজারেও। তাই যে কোনো সময় দেশের বাজারেও দাম কমানো হতে পারে।
এর আগে সবশেষ গত ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় দেশের বাজারে সমন্বয় করা হয়েছিল স্বর্ণের দাম। সে সময় ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরিতে ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল মূল্যবান এই ধাতুর দাম।