গ্যাস সংকটে জনজীবনে যেমন দুর্ভোগ সীমাহীন তেমনি দুর্ভোগ কমাতে সরকারের চেষ্টারও কমতি নেই। আবাসিকে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি এলপিজির কৃত্রিম সংকট মানুষকে বেশি ভোগাচ্ছে। অভিযান চালিয়েও কার্যকর সমাধানে আসা যাচ্ছে না। এর পেছনে মূল কারণ হলো খ্চুরা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের বাজার বেসরকারি খাত নির্ভর। এখানে চেষ্টা করেও এলপি গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরাসরি এলপিজি আমদানীর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সূত্র জানায়,দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খাতে চলমান তীব্র সংকট নিরসন ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি পর্যায়ে সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত ১০ জানুয়ারি সরকার থেকে সরাসরি (জিটুজি) ভিত্তিতে এই আমদানির অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসি।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশের এলপিজি বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডারের দামের ওপর সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। এর ফলে সরবরাহ ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই বাস্তবতায় সরকারি উদ্যোগে এলপিজি আমদানির মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং কৃত্রিম সংকট মোকাবেলায় বিপিসির প্রধান লক্ষ্য।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, বাজারে বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। বেসরকারি অপারেটরদের অনেকেই বিভিন্ন জটিলতার কারণে নিয়মিত আমদানি করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি করা হলে তা বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমেই দ্রুত বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের হাতে একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি হবে। তবে বিপিসির নিজস্ব অবকাঠামো না থাকায় বেসরকারি অপারেটরদের টার্মিনাল ও খালাস সুবিধা ব্যবহার করেই এই কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বলেন, এলপিজির বাজারটা কার্যত বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। সরকারিভাবে কিছু আমদানি করা গেলে বাজারে ভারসাম্য আসবে। তাই আমরা আমদানির অনুমতি চেয়েছি। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানা জটিলতায় এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। বিপিসি আমদানি করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহ করতে চায়। এতে সংকট দূর হবে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নায়। যদিও ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা, বাস্তবে অনেক জায়গায় তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিপিসির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এলপিজির সরবরাহ বাড়বে এবং ভোক্তারা তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি পাবেন বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বেসরকারি খাতকে সরবরাহ করলে একই পরিস্থিতি থাকবে। বেসরকারি খাতে এলপিজির দাম প্রতি মাসে নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। তবে সেই দামে এলপিজি বিক্রি হয় না বাজারে। তাই আমদানি করে বিপিসি সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি না করলে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। আগেও এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার, তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বিপিসির চিঠিতে বলা হয়, দেশের এলপিজি আমদানির জন্য বিপিসির নিজস্ব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এ মুহূর্তে নেই। তবে বেসরকারি অপারেটররা কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র এলাকায় এলপিজিবাহী বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে নিজেদের টার্মিনালে নিয়ে গিয়ে সংরক্ষণ ও বিতরণ করে থাকে। বিপিসিও একই পদ্ধতিতে বেসরকারি অপারেটরদের সুবিধা ব্যবহার করে আমদানি করা এলপিজি খালাস ও বণ্টন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের তালিকা, আমদানির পরিমাণ, মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি, খালাস ও বণ্টনপ্রক্রিয়া এসব নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে চিঠিতে।
বিপিসির আমদানির সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, নানা কারণে এলপিজি খাতে সংকট চলছে। এখন বিপিসি আমদানি করে পরিস্থিতি ভালো করতে পারলে ভোক্তারা উপকৃত হবেন। দেশে সরকারিভাবে এখনো এলপিজি আমদানি হয় না। তবে আমরা সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করছি। আমদানি করা গেলে বাজারে ভারসাম্য আসবে।
সূত্র জানায়, দেশে সরকারি ও বেসরকারি দু’ভাবে এলপিজি বাজারে আসে। সরকারি পর্যায়ে সীমিত এলপিজি সরবরাহ করে বিপিসির তিনটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারিভাবে এলপিজি বিক্রি হয়েছে ১৯ হাজার টন। সরকারি এই বিক্রির বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই চাহিদার বড় অংশ জোগান দেয়।
লোয়াব ও বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে ২৩টি কোম্পানির আমদানি সক্ষমতা আছে। তবে বড় পরিসরে আমদানি করে মূলত পাঁচ-ছয়টি কোম্পানি। গত বছর আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টন। বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের ঘোষিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। তবে বাজারে এ দামে সিলিন্ডার বিক্রি হয় না। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সংকট ও সরবরাহের চাপে বাজারে সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা এম শামসুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, বিগত সরকারগুলো এলপিজি খাতকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে ফেলেছে। তাই ভোক্তাবান্ধব সিদ্ধান্ত দরকার। প্রয়োজনে সরকারিভাবে আমদানি করে সরবরাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আবাসিক লাইনে গ্যাস নেই । এখন বাজারে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার সংকট । মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করছে। সরকার আপাতত শুধু আমদানির দায়িত্ব নেবে। আর সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের কাজ বেসরকারি খাতই করবে।
গ্যাসের সমস্যা সমাধান করতে যা কিছু করা সম্ভব তা করছি বলে মন্তব্য করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে তিনি এ কথা বলেন।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, মনে রাখতে হবে এলপিজি ব্যবসার ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাতে। আমদানি, সংরক্ষণ, বোতল ও বাজারজাতকরণ তারাই করে থাকে। তিনি আরও লেখেন, বিইআরসি শুধু মূল্য নির্ধারণ করে। জ্বালানি বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত। স্ট্যাটাসের শেষ লাইনে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, গ্রাহকদের অসুবিধার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে দুঃখিত।