দিনের পর দিন লোকসান সামাল দিতে না পেরে দেশের প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা একের পর এক বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের খামার। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতে পেরে দুচোখে অন্ধকার দেখছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে কমছে দাম। অনেক দিন ধরে ডিম ও মুরগির গোশতের বাজারে টানা দর পতনে সংকটে পড়েছে দেশের পোলট্রি শিল্প। প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ফিড (খাবার) ও মুরগির বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ তুলতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। খামারিদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছোট করেছেন। শুধু প্রান্তিক খামারিই নয়; ফিড মিল, ব্রিডার ফার্ম, ওষুধ ও বিপণন খাত-সবখানেই নেমে এসেছে স্থবিরতা।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার শনিবার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, দেশের ডিম ও মুরগির বাজার বর্তমানে প্রকৃত চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না। সরকারের আমলাতন্ত্র এবং অসাধু কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলা ও সিন্ডিকেট চক্রকে সহযোগিতায় ফিড, মুরগির বাচ্চা, ভ্যাকসিন, ওষুধ এবং ডিম-মুরগির বাজারে একটি সংগঠিত,শক্তিশালী ও সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট চক্রের ইচ্ছানির্ভর নিয়ন্ত্রণে পুরো পোল্ট্রি বাজার ব্যবস্থা পণবন্দী হয়ে পড়েছে। এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র পোল্ট্রি খামারিরা এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা।
তিনি জানান, বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের সকল মহলে বারবার তেজগাঁও ডিম সমিতি ও কর্পোরেট গ্রুপগুলোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে সিন্ডিকেটের বিস্তারিত তথ্য, হিসাব ও প্রমাণ সরবরাহ করা হয়েছে। তবুও কেন সরকার এই সিন্ডিকেট চক্র দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, কেন বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে পারছে না তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্র বলছে , ডিম-মুরগির দাম বছরে মাঝে মাঝে ওঠানামা করে। এখন সবজির প্রাপ্যতা বেশি হওয়ার কারণে ডিমের চাহিদা কমেছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও ডিমের চাহিদা কমেছে। এ ছাড়া অন্য বছরের চেয়ে এবার শীতে সামাজিক অনুষ্ঠানের সংখ্যাও কম। ফলে চাহিদা না থাকায় ডিম-মুরগির দাম কিছুটা কম।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সালে যেখানে ১ লাখ ৮০ হাজার খামার ছিল সারা দেশে, সেখানে বর্তমানে ৫০ হাজারের কম। গত ছয় মাসেই বন্ধ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার প্রান্তিক খামার। খামারিরা বলছেন, করপোরেট কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে টিকতে না পেরে তাদের দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। এক পর্যায়ে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
কয়েকজন প্রান্তিক খামারি জানান, ডিম-মুরগির দাম বাড়লেই সরকার নড়েচড়ে বসে, অথচ সিন্ডিকেটের কারসাজিতে যখন দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় এবং প্রান্তিক খামারিরা ধ্বংসের মুখে পড়ে তখন কেন সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করছে না, সেই প্রশ্ন আজ দেশজুড়ে। প্রান্তিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যারা ১৮ কোটি মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করেন, সেই কৃষক খামারি কেন অবহেলিত?
সূত্র জানায়, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ডিম ও মুরগির দামের ওঠানামার পেছনে প্রকৃত অর্থে কোনো চাহিদা বা যোগানের সংকট নেই। উৎপাদন হঠাৎ বাড়েনি, কমেওনি। তবুও কখনো বলা হয় উৎপাদন বেশি, কখনো বলা হয় উৎপাদন কম এই বক্তব্যগুলো মূলত পূর্বপরিকল্পিত ও পুনরাবৃত্ত বয়ানের অংশ। বাস্তবে দাম বাড়ে বা কমে মূলত সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে। সরকার দাম বাড়লে অভিযান পরিচালনা করে, কিন্তু দাম কেন অস্বাভাবিকভাবে কমে গেল, কেন প্রান্তিক খামারিরা সরকার ঘোষিত উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেনÍতা খতিয়ে দেখা হয় না। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। বাস্তবতা হলো, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো শুধু দাম বাড়লে দাম কমিয়ে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু সরকার নিজেই যে উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করেছে, সেই উৎপাদন খরচের নিচে ডিম-মুরগি বিক্রি করে প্রান্তিক খামারিদের লোকসান কেন সহ্য করতে হচ্ছে সে বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, ডিমের বাজারে তেজগাঁও ডিম সমিতিকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তারা সারাদেশে ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমস্ত প্রমাণ বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের কাছে রয়েছে। সরকার নির্ধারিত খামার পর্যায়ে প্রতি পিস ডিমের দাম ১০.৫৮ টাকা, যেখানে প্রান্তিক খামারিরা বাধ্য হচ্ছেন ৭–৮ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। গরে একটি ডিমের ৩ টাকা লোকসান ধরলে প্রতিদিন প্রায় ৪–৪.৫ কোটি পিস ডিম উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্রান্তিক খামারিরাই উৎপাদন করেন প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ পিস ডিম। প্রতিদিন ডিম উৎপাদনেই প্রান্তিক খামারিদের ক্ষতি প্রায় ৯.৬০ কোটি টাকা এবং তিন মাসে ডিম খাতে মোট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে , মুরগির বাজারেও একই চিত্র বিরাজ করছে। মুরগির বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন কর্পোরেট কোম্পানির নিজস্ব উৎপাদন এবং তাদের কন্টাক্ট ফার্মিং এর মাধ্যমে উৎপাদনের মুরগির দ্বারা। সরকার নির্ধারিত খামার পর্যায় ব্রয়লার মুরগির দাম ১৬৯ টাকা হলেও খামারিরা বিক্রি করছেন ১২০-১৩০ টাকায়। সোনালি মুরগির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত খামার পর্যায় ২৬০ টাকার পরিবর্তে খামারিরা পাচ্ছেন ২০০-২৩৫ টাকা। ঘরে প্রতি কেজি মুরগিতে ৩০ টাকা লোকসান ধরলে প্রতিদিন প্রান্তিক খামারিরা মুরগিতে প্রায় ১০.৫ কোটি টাকা লোকসান ভোগ করছেন এবং তিন মাসে মোট ক্ষতি প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকা। ডিম ও মুরগি মিলিয়ে গত তিন মাসে প্রান্তিক খামারিদের ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৮০৯ কোটি টাকা। এটি দেশের হাজার হাজার প্রান্তিক খামারির শ্রম, পুঁজি ও জীবিকার ক্ষতি।
সূত্র বলেছে, লোকসানের ফলে ইতোমধ্যে হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়েছে। বহু খামারি দেউলিয়া হয়ে বাধ্য হচ্ছেন কর্পোরেট কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক খামারে যুক্ত হতে। যদি প্রান্তিক খামারিরা উৎপাদনে টিকে না থাকে, ভবিষ্যতে পুরো বাজার কর্পোরেট কোম্পানি, ডিম ব্যবসায়ী সমিতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। তখন প্রতিযোগিতা থাকবে না, সরবরাহ সংকট তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষকে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে ডিম ও মুরগি কিনতে হবে।বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন জোর দিয়ে জানাচ্ছে সরকারি মূল্য বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে তেজগাঁও ডিম সমিতি ও ৮-১০টি কর্পোরেট কোম্পানির সম্মিলিত সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজি রয়েছে।
সোনারগাঁয়ের কাচপুর এলাকার খামারি মাসুম মাহমুদ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৯ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ৭ দশমিক ৫০ টাকায়। প্রতিদিন লোকসান ২২ হাজার টাকার বেশি। মাস শেষে তা দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকা। তিনি বলেন, শীতকালে সাধারণত ডিমের দাম ভালো থাকে। তবে এ বছর উল্টো। সামনে রমজান আসছে, দাম আরও কমবে। এই ক্ষতি দেখার যেন কেউ নেই।
বন্দর মদনপুর এলাকার খামারি সিপুল সরকার দৈনিক সংগ্রামকে জানান, খাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ছে, রোগবালাই লেগেই আছে। অথচ ডিমের দাম উৎপাদন খরচের অনেক নিচে। অনেক খামারি ইতোমধ্যে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। আমরাও টিকে থাকার লড়াই করছি।
ডেমরা কোনপাড়ার খামারি তুহিন শেখ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, প্রায় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সাড়ে ছয় হাজার লেয়ার মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন। এখন প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে। দুই মাসে লোকসান দাঁড়িয়েছে অন্তত সাত লাখ টাকা। ডিম ও মুরগির দাম পড়ে যাওয়ায় খামারিরা নিয়মিত ফিড ও ওষুধ কিনতে পারছেন না।
রায়েরবাগ মোহাম্মদ বাগের খামারি মেহেদী হাসান রনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, অনেক খামারে খাদ্য সরবরাহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে ফিড ও ওষুধ ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত আলী মনে করেন , ডিম-মাংসের ক্ষেত্রে আমরা চিন্তা করি ভোক্তার কথা, উৎপাদকের কথা ভাবি না। যেখানে একটি ডিম উৎপাদন খরচ ১০ টাকা সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রায় ৮ টাকার মতো। এভাবে বাজার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা যায় না। প্রান্তিক খামারিরা এতে ধ্বংস হয়ে যাবে। কয়েক বছর পর দেখা যাবে প্রান্তিক পর্যায়ে কেউ এ পেশায় আসতে চাইবেন না। নিম্ন আয়ের মানুষের পুষ্টির একটি বড় উৎস ডিম ও ব্রয়লার মুরগি। এ জায়গা তাদের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেলে বড় সংকট দেখা দেবে। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগে সরকারকে এ খাতের দিকে নজর দিতে হবে।
বিপিএর ৭ দফা দাবি
এদিকে সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন প্রস্তাব করেছে জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠনের পাশাপাশি ৭ দফা দাবী জানান সরকারের কাছে। দাবী গুলো হল , প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য কৃষক/খামারি আইডি কার্ড প্রদান। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সহ খাত সংশ্লিষ্ট সকল নীতি নির্ধারণী পর্যায় মিটিং গুলোতে প্রান্তিক খামারিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা,প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহজলভ্য, জামানতবিহীন এবং সুদ কম ঋণ প্রদান, সরকার নির্ধারিত উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে ডিম ও মুরগির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, তেজগাঁও ডিম সমিতি ও কর্পোরেট কোম্পানির ফিড, বাচ্চা মুরগি, ভ্যাকসিন ও ওষুধের সিন্ডিকেট অবিলম্বে বন্ধ করা, দাম সরকার নির্ধারিত মূল্যের নিচে বিক্রি হলে প্রান্তিক খামারিদের ক্ষতিপূরণ বা ভর্তুকি প্রদান করা। কর্পোরেট কোম্পানির নিজস্ব উৎপাদন ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিং সীমিত করা, প্রান্তিক খামারিদের জন্য বাজার নিশ্চিত করা। সরকারের পর্যবেক্ষণ ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ডিম ও মুরগির বাজারে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা ও সিন্ডিকেটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত।