পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতারি বাজার জমে উঠেছে। এখানকার বিভিন্ন পদের খাবারের চিরচেনা জৌলুস আর ঘ্রাণ ভোজনরসিকদের টেনে আনে দূর-দূরান্ত থেকে। রমযানের শুরু থেকে চকবাজারের শাহী মসজিদের সামনের সড়কে হাকডাক চলছে, এই নিয়ে যান ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ কাবাব, এই লাচ্চি–ফালুদা! এই দিকে, এই দিকে দই বড়া!

২০-৩০ বছর ধরে চকে ইফতারি বিক্রি করা আনোয়ার হোসেন বলেন, পুরান ঢাকার ইফতারির ঐতিহ্যই আলাদা, ভেজাল পেলে বলে যাবেন। খোকন মিয়ার ঐতিহ্যবাহী শাহী দই-বড়া ও বোরহানি, যা দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে চকবাজারের মানুষের তৃপ্ত করে আসছে। ৩৮ বছরের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে মাসুম নামের এক বিক্রয় কর্মী বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থাইকা আমরা এই চকবাজারে শাহী দই-বড়া আর বোরহানি বেচতাছি। মানুষ বিশ্বাসের ওপর আমাগো কাছে আহে। ৩৮ বছর ধইরা একই স্বাদ ধইরা রাখা সহজ না, তয় আমরা মানের লগে আপস করি না।’

চকবাজারে হোটেল আমানিয়ার মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিশাল ইফতারির তালিকা নিয়ে হাজির হয়েছে। সড়কের ওপর অস্থায়ী দোকানেও মানভেদে ভিন্ন দাম। এখানে সাধারণ পাকুড়া, আলুর চপ ও বেগুনি মাত্র ১০ টাকায় মিলছে, পাশাপাশি মরিচ ফ্রাই ৫ টাকা, ডিম চপ ২০ টাকা, ডিম টোস্ট ৩০ টাকা, বেগুন টোস্ট ও পাম্পকিন টোস্ট ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিকেন সিংগারা ও চিকেন সমুচা ১৫ টাকা, ঝালি কাবাব ৩০ টাকা, চিকেন কাটলেট ৩০ টাকা এবং বোনলেস চিকেন ফ্রাইও ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। চিকেন ফ্রাই ১৩০ টাকা, আর চিকেন স্টিক ৪০ ও ৮০Ñদুই দামে বিক্রি হয়। রোল, নান ও পরোটার মধ্যেও রয়েছে নানা আয়োজন। সবজি রোল ৩০ টাকা, চিকেন রোল ৪০ টাকা, চিকেন শরমা ৮০ টাকা। প্লেন পরোটা ৩০ টাকা, চিকেন পরোটা ৭০ টাকা, দুধ নান ৭০ টাকা, বাটার নান ৪০ টাকা এবং চিকেন নান ৮০ টাকায় মিলছে। এছাড়া চিকেন আস্থন ২৫ টাকা ও চিকেন সাসলিক ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

গ্রিল ও রোস্ট আইটেমে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। লেগ রোস্ট ৩২০ টাকা, আস্ত লেগ রোস্ট ৮০০ টাকা, চিকেন গ্রিল ফুল ৪৮০ টাকা, চিকেন আলফাহাম ৫২০ টাকা, কোয়েল রোস্ট ১২০ টাকা, কবুতর রোস্ট ৩০০ টাকা এবং আস্ত চিকেন রোস্ট ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিষ্টান্নেও কমতি নেই চকে। দই-চিড়া প্রতি বাটি ১০০ টাকা, ফালুদা ছোট বাটি ১২০ টাকা এবং বড় বাটি ৫০০ টাকা। রেশমি জিলাপি ৫০০ টাকা কেজি এবং সাধারণ জিলাপি ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পানীয়ের মধ্যে বোরহানি প্রতি লিটার ২০০ টাকা, হাফ লিটার ১০০ টাকা এবং ঐতিহ্যবাহী লাবাং প্রতি লিটার ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ছোলাবুট প্রতি কেজি ২৪০ টাকা।

হোটেল আমানিয়ার একজন বিক্রেতা বলেন, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে ব্যবসা করা কঠিন। তাও আমাগো কাস্টমাররা পুরান ঢাকার মানুষ, তারা দামের চেয়ে স্বাদ খুঁইজা পায় বেশি। এবার আমরা চিকেন আলফাহাম ৫২০ টাকা আর আস্ত চিকেন রোস্ট ৪২০ টাকায় দিচ্ছি, যা অন্য কোথাও এই দামে পাওয়া মুশকিল।

ইফতারি কিনতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, চকের ইফতারি মানেই তো অন্যরকম ভাইব। জিলাপি ছাড়া তো ইফতার জমেই না। এখানে ৫০০ টাকার রেশমি জিলাপি যেমন আছে, আবার সাধারণ জিলাপিও ২৮০ টাকায় পাওয়া যায়। দাম একটু বেশি মনে হলেও ভিড় দেখে বোঝা যায়, মানুষ চকের খাবার কত পছন্দ করে। অন্যদিকে, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ ক্রেতা আলহাজ মকবুল হোসেন স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, আগে তো লাবাং আর বড় বাটির ফালুদাই ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন আইটেম অনেক বাড়ছে। ২৫০ টাকার লাবাং আর ৫০০ টাকার বড় ফালুদা নিয়া বাসায় যামু, নাতি-নাতনিরা পথ চাইয়া বইসা আছে।