এলপি গ্যাস সংকট নিয়ে আগাম কোন পরিকল্পনা না থাকায় খুব তাড়াতাড়ি সংকট ঘনীভূত হয়ে পড়েছে। সারা দেশে সংকট বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেকটা নড়ে চড়ে বসে সংশ্লিষ্টরা। সরকারের পক্ষ থেকে এলপি গ্যাসের সংকট সমাধানে নেয়া হয় ম্যারাথন পরিকল্পনা। আগামী ২মাসের লক্ষ্যমাত্র নিয়ে শুরু হয়েছে কার্যক্রম। আস্তে আস্তে সংকট কমে যাওয়ার আশ^াসও দিয়েছে জ¦ালানি মন্ত্রণালয়।
এদিকে রিফিল করার জন্য এলপিজি সিলিন্ডার নিচ্ছে না কোম্পানিগুলো। ফলে দোকানের গোডাউনে জমছে সিলিন্ডারের সংখ্যা।
খুচরা দোকানিরা বলছেন, গ্যাস সংকট নিয়ে কথা না বলতে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আমাদের ওপরে চাপ রয়েছে। ফলে এ নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি না। ক্ষেত্র বিশেষে গ্যাস সরবরাহ না করার কথাও বলা হচ্ছে।
রাজধানীতে কয়েকজন খুচরা এলপিজি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। তারা সবাই বলছেন, সংকট যে রয়েছে তা সরকার এবং কোম্পানিগুলো স্বীকার করছে না। বিক্রেতাদের প্রশ্ন, এত এলপিজি মজুত থাকলে তারা দিতে পারছে না কেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর, রামপুরা, খিলগাঁও এবং কাঠালবাগানসহ বেশকিছু এলাকায় খোজ নিয়ে এমন খবর পাওয়া গেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, তাদের দোকানে এবং গোডাউনে বিভিন্ন কোম্পানির খালি সিলিন্ডার জমা হচ্ছে। ফেরত দিতে চাইলে কোম্পানিগুলো এসব সিলিন্ডার ফেরত নিচ্ছে না। কোম্পানির তরফ থকে বলা হচ্ছে, ‘এলপিজি কেনা হচ্ছে। জাহাজ এলেই রিফিলের জন্য সিলিন্ডার নেওয়া হবে।’
সেগুনবাগিচা বাজারের ব্যবসায়ী আমিনুল হক জানান, যে কোম্পানির কাছ থেকে তারা গ্যাস কেনেন, তাদেরকেই খালি সিলিন্ডার ফেরত দিতে হয়। অন্য কোম্পানির খালি সিলিন্ডার তারা নেন না। অর্থাৎ গ্রাহক যদি একবার এক কোম্পানির সিলিন্ডার কেনেন, তাকে আবার কিনতে হলে সেই কোম্পানির গ্যাসই নিতে হয়। তিনি অন্যকোনও কোম্পানির গ্যাস নিতে চাইলে বাড়তি অর্থ গুনতে হয়। বর্তমানে বাজারে অনেক কোম্পানির সিলিন্ডার রয়েছে। কিন্তু কেউই সেগুলো রিফিল করছে না। এতে কারণেও গ্যাসের দাম বেশি পড়ছে।
শান্তিনগর এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা হাসান হাবিব বলেন, আমি যে কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করতাম, সেই কোম্পানি এলপিজি রিফিল করছে না। আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে এলপিজি কিনতে হচ্ছে।
তিনি জানান, ডিস্টিবিউটররা বলছেন, তারা কোনও খালি বোতল ফেরত নেবে না। কেবলমাত্র যে কোম্পানির গ্যাস আছে, সিলিন্ডারসহ সেটা কিনতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ে একটি খালি বোতল ৮০০ টাকা দিয়ে কিনলেও এখন ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এই ব্যবসায়ী জানান, সরবরাহকারীরা বলেছেন যে, খুব শিগগিরই নাকি সংকট কেটে যাবে। কয়েকটি কোম্পানি নাকি এলপিজির আমদানি বাড়িয়েছে।
এদিকে রমযানের আগেই সংকট কাটাতে দুই মাসের আমদানির লক্ষ্যমাত্রার কথা জ্বালানি উপদেষ্টা ফওজুল কবির খানকে জানিয়েছে এলপিজি অপারেটর কোম্পানিগুলো। বুধবার বিকালে চলমান সংকট নিরসনে জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন অপারেটররা। সেখানে তারা দুই মাসে (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) মোট ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির কথা জানান।
উপদেষ্টা ফওজুল কবির বলেছেন ‘জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অপারেটররা যে এলপিজি আমদানির কমিটমেন্ট দিয়েছেন, তা যেন বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। এই লক্ষ্যে সরকারও সব ধর ‘যারা এলপিজি আমদানি করেন,আমরা সবার সঙ্গে বসেছিলাম। কোম্পানিসহ বড় আমদানিকারকদের সঙ্গে বসেছিলাম। বিঘœটা হলো কেন? সমস্যার কারণ তারা জানিয়েছেন যে, আগে আমাদের দেশে ইরান থেকে এলপিজি আসতো। এগুলো আগেও আমাদের জানিয়েছিল। সেখানে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আছে। তো এবার তারা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য ইরানি এলপিজি বহন করা জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এখন তারাই তো এই অঞ্চলে এলপিজি আনে। এজন্যই সমস্যাটা হয়েছে। এখন তারা (আমদানিকারক) বিকল্প উৎস থেকে আনছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানির পরিমাণ বাড়াতে সরকারিভাবে বিপিসিকে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। উপদেষ্টা বলেন, এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে বিপিসিকে। ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরুর জন্য বিপিসির চেয়ারম্যানকে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হচ্ছে।’
এত কিছুর পরেও এখনও পর্যন্ত কোনও সুফল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বৃহস্পতিবার কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকে জানা যায়, তারা ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৩০০ টাকায় কিনেছেন।
বনশ্রীর বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম জানান, সকালে গ্যাস শেষ হয়ে যায়। সারা এলাকা ঘুরেও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছিল না। দুপুরে রান্না তো করতে হবে। পরে রামপুরা বাজারে গিয়ে ২৩০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনলাম। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালাম সরকার বলেন, তিনিও ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন ২৬০০ টাকা দিয়ে।
কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে মোট এলপিজি আমদানির সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে এক লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টনে।
কোম্পানিভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে নাভানা এলপিজি লিমিটেডের লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৫০০ টন এবং ফেব্রুয়ারিতে তিন হাজার টন। টিএমএসএস এলপিজি লিমিটেড জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার ৩০০ টন। এসকেএস এলপিজি এই দুই মাসে পাঁচ হাজার টন করে আমদানির পরিকল্পনা করেছে।
বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড জানুয়ারিতে ১৬ হাজার ৫০০ টন এবং ফেব্রুয়ারিতে ২০ হাজার টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্য ধরেছে। পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেড দুই মাসে ১২ হাজার টন, জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড ৯ হাজার টন, ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ২৫ হাজার টন, জামুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড ৭১ হাজার ৫০০ টন, লাফস গ্যাস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ১৬ হাজার টন, ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড ১৬ হাজার ৬০০ টন, ইউনাইটেড আইগাজ এলপিজি লিমিটেড ১৫ হাজার টন এবং মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড ৩০ হাজার টন করে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছে।
জানা গেছে, দেশে বছরে এলপিজির মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় ১২ লাখ থেকে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। সরকারি এলপিজি কোম্পানি ‘এলপি গ্যাস লিমিটেডের’ দুটি প্রধান প্ল্যান্ট রয়েছে চট্টগ্রাম ও সিলেটের কৈলাশটিলায়। এই দুই প্ল্যান্ট মিলিয়ে বছরে মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। বাকি চাহিদার বেশিরভাগ বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে থাকে। ফলে এলপিজির বাজার পুরোটাই এখন বেসরকারি খাতের হাতে জিম্মি, এ অভিযোগ ভুক্তভোগী গ্রাহকদের।