পবিত্র ঈদুল আযহা সামনে রেখে রাজধানীর কুরবানির পশুর হাটগুলোতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন হাটে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গরুর হাঁকডাক, দরদাম আর মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠছে হাটগুলো।
রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এবার মোট ২৭টি পশুর হাট বসেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৬টি হাট পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রাজধানীর সবচেয়ে বড় ও পরিচিত গাবতলী পশুর হাট অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্যতম বড় ও ঐতিহ্যবাহী হাট-কমলাপুর অস্থায়ী পশুর হাট।
সরেজমিন দেখা দেখা গেছে, গতকাল সোমবার ভোর থেকেই রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে ব্যাপক কোলাহল। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি গরু, ছাগল ও মহিষ এসে পৌঁছাচ্ছে হাটে। কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, কুমিল্লা, নওগাঁ ও রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার খামারিরা তাদের পশু নিয়ে রাজধানীর বাজারে এসেছেন ভালো দামের আশায়। হাট ঘুরে দেখা গেছে, দেশি মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বড় একটি অংশ সাধ্যের মধ্যে ভালো পশু খুঁজছেন। অনেকেই পরিবার নিয়ে হাটে এসে পশু দেখছেন, দরদাম করছেন এবং পছন্দের পশু কিনে নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ শুধু হাটের পরিবেশ উপভোগ করতেও আসছেন। ক্রেতারা জানান, কয়েক দফা দরদামের পর তুলনামূলক সহনীয় দামে পশু পাওয়া গেলেও বড় আকারের গরুর দাম এখনও বেশ চড়া। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, এ বছর খামারিদের আনা পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বাজারে নানা দামের পশু পাওয়া যাচ্ছে। তবে ঈদের আগের শেষ দুই দিনেই সবচেয়ে বেশি বিক্রির আশা করছেন তারা। শাহজাহানপুর হাটে আগত রাইসুল নামের এক খামারি বাসসকে বলেন, খাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। তাই কিছুটা বেশি দাম চাইতেই হচ্ছে। তবে ক্রেতাদের সাধ্যের কথাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এদিকে হাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জাল টাকার ব্যবহার ঠেকাতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীর প্রতিটি বড় হাটে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক স্থাপন করেছে জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ ও টাকা গণনার মেশিন। অনেক ব্যাংক মাত্র পাঁচ মিনিটে হিসাব খোলার সুবিধাও দিচ্ছে পশু ব্যবসায়ীদের। কুরবানির পশুর বাজার পরিদর্শনে এসে মৎস প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, দেশে এবার কুরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। দেশীয় খামারিদের উৎপাদিত পশু দিয়েই চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। তিনি জানান, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কুরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লক্ষাধিক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
ডিএসসিসির আওতাধীন অস্থায়ী হাটগুলো বসেছে- পোস্তগোলা, শাহজাহানপুর, রহমতগঞ্জ, আমুলিয়া, শ্যামপুর, আফতাবনগর, কাজলা-মাতুয়াইল এলাকা, দয়াগঞ্জ-জুরাইন, বনশ্রী, গোলাপবাগসহ বিভিন্ন এলাকায়। অন্যদিকে ডিএনসিসির অধীনে মিরপুর, কালশী, বছিলা, উত্তরা দিয়াবাড়ি, ভাটারা, বাড্ডা, মহাখালী ও বসুন্ধরা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বসেছে অস্থায়ী পশুর হাট। রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে এখন যেন এক ভিন্ন আবহ। ক্রেতাদের দরদাম, বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর কুরবানির প্রস্তুতিতে নগরজীবনে যোগ হয়েছে ঈদের আমেজ। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে হাটের প্রাণচাঞ্চল্য ও কেনাবেচার গতি।
এদিকে, মুগদা বিশ্বরোড, মানিকনগর টিটিপাড়া স্টেডিয়াম, আন্ডারপাস হয়ে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঐতিহ্যবাহী কমলাপুর অস্থায়ী পশুর হাটে এখন জমে উঠছে কুরবানির পশুর বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও ব্যাপারীরা গরু নিয়ে এসেছেন এখানে। এখনো ট্রাকে করে নতুন নতুন পশু আসছে। সড়কপথের পাশাপাশি এবার রেলপথেও বিপুল পরিমাণ পশু কমলাপুরে এসেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকযোগে গরু নিয়ে আসছেন ব্যাপারীরা।
পবিত্র ঈদুল আযহার আর মাত্র তিন দিন বাকি। গত দুই দিন ক্রেতার সমাগম কম দেখা গেলেও সময় যত ঘনিয়ে আসছে, পশুর হাটে ততই বাড়ছে ক্রেতাদের ভিড়। সোমবার সকাল থেকে ক্রেতা কম থাকলেও সময় যত গড়াচ্ছে ততই ক্রেতা বাড়ছে। হাটসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের শুরুর দিকে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও গত দুই দিন ধরে বেচাকেনা জমে উঠেছে। অনেকেই শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা না করে এখনই পছন্দের পশু কিনতে হাটে আসছেন। গতকাল সোমবার কমলাপুর পশুর হাট সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, দেশি গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও বড় গরুও কিনছেন অনেকে। আবার অনেকে খুঁজছেন ছোট গরু। গরু কিনতে আসা ক্রেতা হাফিজুল বলেন, এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। এখনো কিনতে পারিনি। এই হাটে কিনতে না পারলে কাল আরেক হাটে দেখতে হবে। কালকের মধ্যেই কিনে ফেলব। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বিক্রেতা ও খামারিদের মধ্যে ভালো দাম পাওয়ার আশা দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ কাজ করছে। দেশের সীমান্তঘেঁষা হাটগুলো বন্ধ থাকা এবং ভারত ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে পশুর প্রবেশ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় বাজার এখন পুরোপুরি দেশীয় পশুর ওপর নির্ভরশীল। গত বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে দেশের কিছু বড় খামার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এবার বাজারে পশুর অতিরিক্ত কৃত্রিম চাপ নেই। ময়মনসিংহ থেকে ১৫টি গরু নিয়ে এসেছেন হোসেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত একটি গরু বিক্রি করেছি। এখন মানুষ আসছে আর দেখে যাচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ গরু কিনবে কাল ও আগের দিন। গতবার ১৬টি গরু এনেছিলাম। সব বিক্রি হয়েছিল। এবারও হবে আশা করছি।
হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা জানান, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। ঈদের আগের দুই দিনে হাটে সবচেয়ে বেশি ভিড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। হাসিলঘরের দায়িত্বে থাকা ইসমাইল বলেন, এবার গরুপ্রতি শতকরা ৫ টাকা হারে নেওয়া হচ্ছে। সকাল থেকে খুব বেশি ক্রেতা ছিল না। বৃষ্টির কারণে অনেক ক্রেতাই আসতে পারেননি। এখন বিকেল যত গড়াচ্ছে, আমাদের চাপ ততই বাড়ছে। কাল (মঙ্গলবার) সবচেয়ে বেশি গরু বিক্রি হবে বলে আমরা আশা করছি।