এলপিজির দাম অস্বাভাবিক হওয়া কারসাজির ফল : জ¦ালানি উপদেষ্টা

দাম বৃদ্ধির কারসাজির দায় খুচরা বিক্রেতাদের : লোয়াব

বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ অনেক কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ

এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির খবরে একদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিইআরসি ও ভোক্তা অধিদপ্তর বাজারে নজরদারি বাড়িয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় মোবাইল কোর্টের অভিযান চলছে। তবে অভিযানের খবর পেয়ে অনেক খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে পলিয়েছে। মোবাইল কোর্টে জরিমানা গুণতে হবে এমন ভয়ে অনেকে দোকান খুলছে না। দোকান বন্ধের সাইনবোর্ড টানিয়েছে অনেকে। ফলে গ্রাহকদের বিড়ম্বনা আরো বেড়েছে । অনেকে এ দোকান ওই দোকান ঘুরেও পাচ্ছে না এলপিজি।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সাধারণত ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলপিজি আমদানি করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এলপিজি পরিবহনকারী কয়েকটি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, যা বাজারে ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট স্বল্পমেয়াদি নাকি দীর্ঘমেয়াদি, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ অনেক কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ রয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে জানিয়েছেন, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ।

উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির দাম কিছুটা বাড়িয়েছে। এই দাম বাড়ার আশঙ্কাকে সামনে রেখে কিছু ব্যবসায়ী আগেভাগেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে বাজারে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়েছে।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবিনেট সেক্রেটারিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের প্রতিটি জেলায় এলপিজির দাম তদারকিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। গৃহস্থালীর রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি তার।

উপদেষ্টা জানান, সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারের প্রায় ৯৮ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। সরকারি কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি মাত্র ২ শতাংশ এলপিজি উৎপাদন করে।

এদিকে এলপি গ্যাসের দামে কারসাজির দায় খুচরা বিক্রেতাদের উপর চাপিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। জড়িত বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

লোয়াবের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এলপিজির মূল্য হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে অনুষ্ঠিত সভায় লোয়াবের প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে শীতের জন্য জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, ইউরোপে শীতকালে জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কিছু কারণে সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। এতদসত্বেও, বর্তমান মজুদ সন্তোষজনক। আমদানি পর্যায়ে কোনো সিলিং থাকবে না মর্মে সভায় আলোচনা হয়। এ সত্ত্বেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে কিছু খুচরা বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন, যার ফলে ভোক্তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে যেন এলপিজি খাতে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি আরও জোরদার করা হয় এবং সরকার নির্ধারিত ন্যায্য মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা হয়।

রাজধানীর শনির আখড়ার এলপি গ্যাস বিক্রেতা মো. নুরুল মোল্লা জানান, এলপি গ্যাস নেই কয়েক দিন ধরে। ডিলাররা ফোন ধরেন না। দোকান বন্ধ করে বসে আছেন। ফোন ধরলেও বলেন যে, গ্যাস নেই। কবে পাওয়া যাবে তাও বলতে পারেন না। বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। আমিও দোকান বন্ধ করে বসে আছি।

পেট্রোম্যাক্সসহ বিভিন্ন কোম্পানির ডিলার এমএন ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. আকাশ আলী বলেন,এলপি গ্যাসের অবস্থা খুবই খারাপ। এক সপ্তাহ ধরে সমস্যা চলছে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বারবার যোগাযোগ করলেও কোম্পানি থেকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে না কবে গ্যাস পাওয়া যাবে। শুধু যে আমার অবস্থা এই রকম তা নয়, সারা দেশের একই চিত্র।’

জানা গেছে, এলপি গ্যাসের সংকটে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এক রকম হাহাকার পড়ে গেছে। ভোক্তাদের ভোগান্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এদিকে তিতাস লাইনের গ্যাসও রাজধানীতে ঠিকমতো পাওয়া যায় না। দিনের বেশির ভাগ সময় মেলে না গ্যাস। চুলায় পাতিল উঠলেও রান্না শেষ হয় না। গ্যাসের সংকটে পড়ে অনেকেই হোটেল থেকে কেনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন।

সূত্র বলছে, শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তার পরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে।

প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। গত ডিসেম্বরে আমদানি করা হয়েছে ৯০ হাজার টন। তাই আমদানি বাড়াতে গত বৃহস্পতিবার এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। কমিশনের আদেশ অনুসারে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ভোক্তার কাছে খুচরা বিক্রেতার কোনো পর্যায়েই বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে না। তাই সব পর্যায়ে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।

গ্যাসের সংকটের ব্যাপারে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘একেবারে এলপিজি না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে আগের মতো চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাবে না। এটাও স্বাভাবিক। কারণ বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ কয়েকটি কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমরা পাঁচ থেকে সাতটি কোম্পানি আমদানি করে বাজারজাত করছি। তাই সরকার আমদানি বাড়াতে তাগিদ দিয়েছে। আমরা সেই চেষ্টায় আছি।’

তিনি বলেন, ‘চাইলেই হঠাৎ করে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব না। প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে এলপিজি আসে। তারপর আমরা ডিলারদের কাছে সরবরাহ করি। এ জন্য হঠাৎ করেই সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব না। সে পর্যায়ে আসতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। যারা বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করছে তাদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে হবে, তাদের ধরতে হবে।’

অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধিতে ক্যাবের তীব্র প্রতিবাদ

এলপিজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। একই সঙ্গে এই মূল্য কারসাজির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাব জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে এলপিজি, সয়াবিন ও পাম তেলের দামে ধারাবাহিক বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার ও বিইআরসির নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির অজুহাতে আমদানিকারক ও পরিবেশকদের একটি অংশ বাজারে কারসাজি করছে। এটি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবেরই প্রতিফলন।

আমদানি বাড়ানোর অনুমতি মেলেনি

জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলপিজি আমদানি কমিয়ে দেয় কিছু কোম্পানি। পরে কিছু কোম্পানি আমদানি বন্ধ করে দেয়। তবে সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়ে বারবার আবেদন করেও সরকারের অনুমতি পায়নি। ফলে এখন তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকট।

প্রায় দুই বছর ধরে বাড়তি আমদানির অনুমতি পেতে জ্বালানি বিভাগে ঘুরছে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সিলিন্ডারে এলপিজি ভর্তি করতে তাদের চারটি প্ল্যান্ট আছে। এর মধ্যে মেঘনাঘাটের বৃহৎ প্ল্যান্টের জন্য বছরে আড়াই লাখ টন এলপিজি আমদানির অনুমতি আছে। এখানে আরও এক লাখ টন আমদানি করা সম্ভব। এর বাইরে মোংলায় ৯০ হাজার টন, বগুড়া ও ভালুকায় ৬০ হাজার করে দুটি এলপিজির প্ল্যান্ট আছে। প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে এ তিন প্ল্যান্টে সীমিত পরিসরে এলপিজি আনা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি নেই বলে আমদানির চূড়ান্ত অনুমতি দিচ্ছে না সরকার।