হঠাৎ পেঁয়াজের বাজারে আগুন। গেলো সপ্তাহের দুই-তিন দিনের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত। এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ বাজারে নতুন পেঁয়াজও আসা শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা যায়, সরবরাহ সংকটের কথা বলা হলেও সিন্ডিকেটের কবলেই পড়েছে পেঁয়াজ। কৃত্তিম সংকট দেখিয়ে বাজার থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

জানা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদনের পরেও বেশ কিছুদিন ধরে অস্থির পেঁয়াজের বাজার। এখন পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। সিন্ডিকেটের পুরোনো ছকে বাঁধা পড়ে গেছেন ভোক্তা সাধারণ। সরবরাহ কমের অজুহাতে একদিনের ব্যবধানে কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়ে গেছে দাম। পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশের খুচরা বাজারে দুই দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম বাড়লেও সরকারের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অনেকেই বলছেন, আমলাদের সাথে আর্থিক আঁতাত করেই পুরনো সিন্ডিকেটই পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জানান, সরবরাহ কম দেখিয়ে সরকারকে আমদানির অনুমতি দিতে চাপ প্রয়োগের কৌশল হাতে নিয়েছেন এ সিন্ডিকেট।

সূত্র জানায়, অসাধুরা ব্যবসায়ীরা মূলত পেঁয়াজ নিয়ে এই ছক তৈরি করেন অক্টোবর থেকেই। প্রতি বছরই এ সময়ে ব্যবসায়ীদের আঁকা ছকের ফাঁদে পড়েন ভোক্তাসাধারণ। বাজারে পণ্যটি কিনতে এসে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। আর এই খেলায় নীরব দর্শকের ভূমিকাতেই থাকে প্রশাসন। সিন্ডিকেটের এই প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র। শনিবার রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। এদিন নয়াবাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকা। রামপুরা কাঁচাবাজারে বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা ও জিনজিরা কাঁচাবাজারে এই পেঁয়াজ ১৪০-১৬০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। অথচ, দুই দিন আগেই প্রতিকেজি পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ১১০ টাকা ছিল এসব বাজারে। আর অক্টোবরের শেষদিকে প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজের খুচরা দাম ছিল ৭০ টাকা। সেপ্টেম্বরে কেজিপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৬০-৬৫ টাকায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. জামাল উদ্দীন বলেন, প্রকৃতপক্ষে বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। আমদানির অনুমতি দিতে সরকারকে বাধ্য করতেই সিন্ডিকেটচক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। অথচ এখনও এক লাখ টনেরও বেশি পুরোনো পেঁয়াজ মজুত আছে।

প্রতিবছর কেন নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়ে, তা নিয়ে পর্যালোচনা তৈরি করেছে ট্যারিফ কমিশন। সংস্থাটির মতে, চার কারণে প্রতিবছর পেঁয়াজের দাম বাড়ে। প্রথমত, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। দ্বিতীয়ত, পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাব। তৃতীয়ত, মৌসুমের শেষ পর্যায়, চতুর্থত, বৃষ্টিতে পেঁয়াজের ক্ষতি। পেঁয়াজ সংরক্ষণের মওসুম হলো জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। সরকারি সংরক্ষণাগার না থাকায় কৃষকেরা নিজেরাই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে থাকেন। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে সরকারিভাবে সংরক্ষণের অভাবকে চিহ্নিত করেছে ট্যারিফ কমিশন। নভেম্বর ও ডিসেম্বর হলো পেঁয়াজের মৌসুমের শেষ পর্যায়। এ সময়ে কৃষকের ঘরে মজুত কম থাকে। সে কারণেও পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। তবে কৃষকের কাছ থেকে বাজারে আসা পর্যন্ত পেঁয়াজের একাধিকবার হাত বদল হয়। প্রতি ধাপে মুনাফা করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। প্রতিটি ধাপেই মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের নির্ধারিত মুনাফায় পেঁয়াজ বিক্রি করে থাকেন। মধ্যস্বত্বভাগীদের অতি মুনাফার কারণেও মওসুমে পেঁয়াজের দাম বাড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদনের পরেও অস্থির পেঁয়াজের বাজার। এখনো দেশে এক লাখ টনের বেশি পুরোনো পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। এরপরও নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ কমিয়ে সরকারকে আমদানির অনুমতি দিতে চাপ প্রয়োগ করছে। তবে তাদের নজর আমদানিতে নয়। বাস্তবতা হচ্ছে ভোক্তার পকেট কেটে বাড়তি মুনাফা করা। আর অসাধুরা সেই ছক তৈরি করে সফল হচ্ছে। আর এই খেলার নীরব দর্শকের ভূমিকায় প্রশাসন। মজুতদাররা সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজ আটকে রেখে দাম বাড়াচ্ছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও দাদন ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে। তারা পেঁয়াজ কিনে মজুত করছে, বাজারে ছাড়ছে না। দেশে ভালো উৎপাদন হলেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানির পাঁয়তারা করছেন। মওসুমে পেঁয়াজ আমদানি হলে কৃষক ঠকবেন। আর এখন বাজারে নজরদারি না বাড়ালে ভোক্তার পকেট কাটা যাবে।

এদিকে কারসাজির মাধ্যমে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। এরপরও সীমিত পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির সুপারিশ করেছে বিটিটিসি। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় কমিশন এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সরকারের বিবেচনার জন্য বাণিজ্য সচিব ও কৃষি সচিবকে পাঠানো হয়েছে। কমিশন জানায়, কিছু মধ্যস্বত্বভোগী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থির করার পাঁয়তারা করছে।