চট্টগ্রাম পেঁয়াজ রসুন আদায় বাড়তি চাপ
অস্বস্তি কাটছে না সবজির বাজারে। শীতের সবজির ভরা এই মওসুমেও কমছে না দাম। গেল সপ্তাহের তুলনায় গতকাল শুক্রবার বেড়েছে শীতের প্রায় সব সবজির দাম। এছাড়া চাল ও ডালের দামও বেড়েছে কেজি প্রতি ৫ থেকে ১৫ টাকা। তবে মুরগি, মাছ ও গরুর গোশতের দাম কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অন্য বছর শীতের এই ভরা মৌসুমে টমেটোর দাম যেখানে ছিল সর্বোচ্চ ৪০-৫০ টাকা, সেখানে তা বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়। অন্যান্য সবজির দামও কেজিতে বেড়েছে ১০-২০ টাকা। অবস্থা এমন যে, শীত মওসুমের সব সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম নিয়ে অস্বস্তি কাটছে না ক্রেতাদের।
রাজধানীর খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রচণ্ড শীতে সবজি তুলতে পারছেন না কৃষকরা। তাপমাত্রা বাড়লে কমবে সবজির দাম।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু ও মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ চলছে। এ ছাড়া ৫ দিনে আবহাওয়ার খুব বেশি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তীব্র শীতে জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সবজির বাড়তি দাম প্রসঙ্গে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে সবজি আসছে কম। তীব্র শীতে কৃষকরা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। ক্ষেত থেকে সময় ও চাহিদা অনুযায়ী সবজি তুলতে পারছে না। যার প্রভাব পড়েছে সবজি সরবরাহে।
তবে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পেঁয়াজ, ডিম, মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম স্বাভাবিক রয়েছে। এক সপ্তাহ আগে প্রতি পিস মাঝারি আকারের ফুল কপি মিলেছে ১৫-২৫ টাকায়। ১০-১৫ টাকা বেড়ে তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকায়। এছাড়া ১০ টাকা বেড়ে প্রতিকেজি মুলা ৪০ টাকায়, বেগুন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০ টাকা বেড়ে প্রতিকেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ৫০-৭০ টাকায়। কিছুটা বেড়ে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। প্রতিকেজি শালগম, পেঁপে, ব্রকলি মিলছে ৩০-৫০ টাকায়। বছরের এই সময়ে টমেটোর দাম থাকে ক্রেতার নাগালের মধ্যে। তবে বাজারে পাকা, কাচাঁ ও আধাপাকা তিন ধরনের টমেটোর দাম ১০০-১২০ টাকা। গত সপ্তাহে ৮০ টাকায় মিলেছে পাকা টমেটো। প্রতিকেজি ঢ্যাঁড়শ, পটল বিক্রি হচ্ছে ৯০-১২০ টাকায়।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ক্রেতা রাসেল বলেন, সবজির দাম কিছুটা বাড়তি। রোজা আসার আগে দাম আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। আরেক ক্রেতা বলেন, এই মওসুমে পাকা টমেটোর দাম থাকে ৪০-৫০ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। ব্যবসায়ীরা বলছেন তীব্র শীতে টমেটো পাকছে না। আবার খবরে দেখি কৃষক দাম পায় না।
গত সপ্তাহের মতো প্রতি ডজন ফার্মের বাদামি রঙের ডিম ১০৫-১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লারের কেজি ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকা আর সোনালি জাতের মুরগির কেজি কেনা যাচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। প্রতিকেজি গরুর মাংস মিলছে ৭৫০-৮০০ টাকায়। প্রতিকেজি পাঙাশ ১৭০-২০০ টাকায়, পাবদা ৪০০-৫৩০ টাকায়, কৈ মাচ ২৫০-৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিকেজি রুই ৩২০-৪২০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০-২৮০ টাকা, কাতলা ৩৪০-৪৪০ টাকা, শিং ৩৪০-৬৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে চাল ও ডালের দাম অনেকটা বেড়েছে। বিশেষ করে দেশি (ছোট দানা) মসুর ডালের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে, বাজারে নতুন চাল আসার প্রাক্কালে পুরোনো চালের দাম কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় অস্বস্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
সপ্তাহের ব্যবধানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত। প্রতি কেজি মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম ৩-৪ টাকা বেড়ে ৮৩ থেকে ৮৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া রশিদ মিনিকেটের দাম ৭২ টাকা থেকে বেড়ে ৭৫ টাকা, নন-ব্র্যান্ডের মিনিকেট ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় এবং দামি মিনিকেট মোজাম্মেলের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়ে ৮৫ থেকে ৮৬ টাকা হয়েছে। একইভাবে বেড়েছে নাজিরশাইল চালের দামও। ধরনভেদে দেশি নাজিরশাইল চাল বিক্রি হয়েছে ৭২ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে, যা সপ্তাহখানেক আগে ৩ থেকে ৪ টাকা কম ছিল। আর আমদানি করা নাজিরশাইলের দাম কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকা হয়েছে।
বছরের এই সময়ে আউশ, আমন ও নাজিরশাইল চাল বাজারে আসার কথা। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সাধারণত প্রতিবছর এসব চাল বাজারে আসার পরে পুরোনো চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বাড়ে। কিন্তু এবার নতুন চাল বাজারে আসার আগেই পুরোনো চালের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খুচরা দোকানে নতুন চাল বিক্রি হতে শুরু করবে। বিক্রেতাদের আশঙ্কা, নতুন চাল আসার পরে পুরোনো চালের দাম আরও বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো: বন্দরনগরী চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বিভিন্ন ধরনের ডালের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে বিপরীতে পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের চাপ বাড়ছে। সবজি, মাছ ও মাংসের দামে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
শুক্রবার বিকেলে নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকান ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দেশীয় নতুন ফলনের ডাল বাজারে আসায় গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েক ধরনের ডালের দাম কমেছে। এই সময়ের মধ্যে কেজিতে মোটা মসুর ডাল ৫ টাকা এবং চিকন মসুর, মুগডাল ও বুটের ডাল ১০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বর্তমানে বাজারে ছোট মসুর ডাল কেজি ১৪০ টাকা, মোটা মসুর ৯০ টাকা, বড় মুগ ১২০ টাকা, ছোট মুগ ১৩০-১৫০ টাকা, খেসারি ১০০ টাকা, বুটের ডাল ৬৫ টাকা, ছোলা ১১০ টাকা ও মাষকলাই ডাল ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে পচনশীল মসলার বাজারে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। দেশি পেঁয়াজ বাজার থেকে প্রায় উধাও, নতুন ফলনের পেঁয়াজও দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমদানি নির্ভরতা বাড়ায় ভারতীয় পেঁয়াজের দাম কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়েছে। মানভেদে নাসিক পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়, কিছু নিম্নমানের পেঁয়াজ ৭৫-৮০ টাকায় মিললেও চাহিদা কম। একই সঙ্গে রসুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা এবং আদার দাম ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে চীনা রসুন ১৫০ টাকা, চীনা আদা ১৫০ টাকা, থাই আদা ১৭০ টাকা, কেরালার আদা ১২০ টাকা ও দেশি আদা ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য মুদিপণ্যের মধ্যে বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৯৮ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৭২ টাকা ও খোলা সরিষার তেল ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিনি ১১০ টাকা ও খোলা চিনি ৯৫ টাকা। দুই কেজির প্যাকেট আটা ১০০-১১০ টাকা, ময়দা ১২০ টাকা। কৌটাজাত ঘি ১৪৫০-১৫৫০ টাকা এবং খোলা ঘি ১২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মসলার বাজারে এলাচ কেজি ৪৭৫০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ টাকা, লবঙ্গ ১২৮০ টাকা, সাদা গোলমরিচ ১৩৫০ টাকা ও কালো গোলমরিচ ১১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
চালের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল। খুচরায় সরু বা মিনিকেট চাল কেজি ৭৮-৮২ টাকা, নাজিরশাইল ৮০-৯০ টাকা। মাঝারি মানের ব্রি-২৮ ও পাইজাম ৬০-৬৬ টাকা এবং মোটা স্বর্ণা জাতের চাল ৫৪-৫৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারে শীতকালীন সরবরাহ ভালো থাকায় দাম ক্রেতার নাগালে রয়েছে। বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মূলা ৩০-৪০ টাকা, টমেটো, শিম ও শালগম ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁকরোল, পটল, গাজর, শসা, করলা, ঢেঁড়স, চিচিঙ্গা, কচুর লতি ও লাউসহ বেশিরভাগ সবজি কেজি ৫০-৬০ টাকা। নতুন আলু ৩০-৩৫ টাকা, পুরনো আলু ২০-২৫ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। শাকসবজি আঁটি ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি, ডিম ও গরু–ছাগলের মাংসের দামেও বড় কোনো পরিবর্তন নেই। ব্রয়লার ডিম ডজনপ্রতি ১১০ টাকা, সাদা ডিম ১০০ টাকা, দেশি ডিম ১৬০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৫৫-১৬৫ টাকা, সোনালি ২৮০-৩০০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারে আগের মতোই উচ্চমূল্য বজায় আছে। কোরাল ৬০০-৭০০ টাকা, লাল পোয়া ৫০০-৬০০ টাকা, রুই–কাতলা ৩৫০-৪৫০ টাকা এবং ছোট আকারের ইলিশ ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সাগরের ছোট চিংড়ি তুলনামূলক কম দামে ৬০-৭০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে ডালের বাজারে স্বস্তি থাকলেও পেঁয়াজ ও মসলার দামে ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।