গ্যাস সংকট নিয়ে জনদুর্ভোগ আপতত শেষ হচ্ছে না। একদিকে রাজধানীর প্রায় এলাকায় আবাসিক লাইনে গ্যাস না থাকায় চরম দুর্ভোগে রয়েছে মানুষ। অনেক বাসা বাড়িতে চুলা জ¦লছে না। এ দুর্ভোগ আরো বাড়িতে তুলছে এলপি গ্যাস নিয়ে লঙ্কাকান্ডে। এলপি গ্যাস ব্যবাসয়ীদের ডাকা ধর্মঘটে দিনভর এলপিজি বিক্রি বন্ধ থাকায় আরো দুর্ভোগ বেড়েছে। যদিও দিন শেষ ধর্মঘট তুলে নিয়ে ব্যবসায়ীরা। তবে সংকট ধীরে ধীরে কমে আসার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে লোয়াবের আবেদন আমলে নিয়ে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতি দিয়ে আমদানি পর্যায়ে এলপি গ্যাসের ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। বাজারে চলমান সংকট নিরসনে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। পাইপলাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় রান্না করতে পারছেন না অনেক পরিবার। এতে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে এলপি গ্যাস, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা লাকড়ির ওপর নির্ভর করছেন। এতে বাড়তি খরচের চাপ পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাফরুল, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এই সংকটের খবর জানা গেছে গেছে। কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে ভোগান্তি বাড়ছে।

সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, মিরপুর, শনিরআখড়া, মগবাজার, রামপুরা, বাড্ডা, বাসাবো, সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার, লক্ষ্মীবাজার, উত্তরা ও দক্ষিণখানসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ এতাই কম যে চুলা জ্বলে না। কোথাও গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস মিললেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না।

ইব্রাহিমপুর এলাকার বাসিন্দা এস এম কালাম দৈনিক সংগ্রামকে জানান , সকালে গ্যাস পাওয়া গেলে সারাদিনের রান্না একসঙ্গে সেরে নেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু গত তিন দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না থাকায় নাশতার জন্য হোটেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর বাসিন্দা আমীর শেখ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, গ্যাস না থাকায় বাসায় নাশতা তৈরি করা যাচ্ছে না। আশপাশের হোটেলগুলোতে রুটি-পরোটার জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ওই স্কুলে শিশুদের জন্য রান্না হলেও গ্যাস সংকটে গত দুই দিন তা বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি বলেন, বাড়ির বয়স্ক ও শিশু সদস্যদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গ্যাস সংকটের সুযোগে ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দামও বেড়েছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অপারেশন ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, আমিনবাজার থেকে আসা একটি গ্যাস পাইপলাইন বুড়িগঙ্গা নদীর নিচে লিকেজ হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গত তিন দিন ধরে কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল একসঙ্গে মেরামতের কাজ করছে। একটি লিক ক্ল্যাম্প বসানো হয়েছে। তবে পুরোপুরি মেরামতের জন্য বিশেষ ধরনের নতুন ক্ল্যাম্প তৈরি করে আবার কাজ করতে হবে। আপাতত লিকেজ কিছতা কমানো সম্ভব হয়েছে। ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত এক মাস ধরে দিনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গত তিন দিন ধরে একেবারেই গ্যাস নেই। সকালে নাশতা না করেই অফিসে যেতে হচ্ছে।

এদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারিত দামে অনেক জায়গায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা।

সারাদেশে বিক্রি বন্ধ করে বৃহস্পতিবার সারাদিন জনসাধারণকে ভোগান্তির মধ্যে রেখে শেষমেশ ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলাটেরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার পর সংগঠনের সভাপতি মো. সেলিম খান সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

বৈঠকে নেতারা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন সারা দেশে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা, বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বৈঠকে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন যে চলমান অভিযানের বিষয়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন এবং চার্জ বাড়াতে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন।

জালাল আহমেদ আরও বলেন, এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন জানিয়েছে যে জাহাজ সংকটের মধ্যেও পণ্য আমদানির জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহের সংকট কিছতা স্বাভাবিক হতে পারে।

তবে সেলিম খান বলেন, অপারেটরদের কাছ থেকে সিলিন্ডার কিনতেই তাদের ১ হাজার ৩০০ টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। তাই ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকার কম দামে বিক্রি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এদিকে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, জানুয়ারি মাসের জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার বেশি দামে পণ্য বিক্রির কোনো যুক্তি তিনি দেখছেন না।

এর আগে সকাল থেকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা, গাজীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে এলপিজি সিলিন্ডারের বিক্রি বন্ধ আছে। এর বাইরে দেশের অন্য জেলায় এলপিজি বিক্রি চলছে। গ্যাসের চলমান সংকট আসন্ন রমজানের আগেই কেটে যাবে বলে আশ্বস্ত করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।

এদিকে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতি দিয়ে আমদানি পর্যায়ে এলপি গ্যাসের ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। বাজারে চলমান সংকট নিরসনে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।

‘এলপি গ্যাস আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুনর্র্নিধারণ’ শিরোনামের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদার ৯৮ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানি কর্তৃক আমদানি করা হয়, যার অধিকাংশ শিল্পখাতসহ গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণভাবে শীতকালে বিশ্ববাজারে এবং দেশে এলপি গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় দাম বাড়ে। তাছাড়া শীতকালে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহও অপেক্ষাকৃত কম থাকায় এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। বর্তমানে এসব কারণে বাজারে এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ জনজীবনে এর প্রভাব পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে এসপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় এলপি গ্যাসকে গ্রিন ফুয়েল বিবেচনায় এর আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স পুননির্ধারণ করার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, সভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের কার্যবিবরণীর ১৩নং আলোচনার উদ্ধৃতি নিম্নরূপ- ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহারপূর্বক ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট এবং আগাম কর অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব প্রণয়ন সময়োপযোগী। তবে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি ক্রয় বাবদ কী পরিমাণ ব্যয় হ্রাস পাবে তা বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এজন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক সমন্বিত পর্যালোচনাপূর্বক পুনরায় প্রস্তাবটি উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে উপস্থাপন করা সমীচীন।’

উপদেষ্টা পরিষদের এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব আংলাদেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় বিস্তারিত আলোচনায় এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে একমত পোষণ করা হলেও উপস্থিত এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা আমদানি পর্যায়ে প্রণীত ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিপরীতে শূন্য শতাংশের দাবি করেন। যদিও উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে এলপিজি অপারেটররা একমত পোষণ করেছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এ অবস্থায় বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উল্লেখিত সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বর্তমান সংকট বিবেচনায় নিয়ে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে তা ১০ শতাংশের নিচে নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট এবং আগাম কর অব্যাহতি প্রদানের বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদের আলোচনার সঙ্গে একমত হয়েছে। এ অবস্থায় এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।