শুরু হয়েছে পবিত্র রমযান, শুরু হয়েছে সেচ মৌসুম, চলছে গরমের আনা গোনা, এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদার পারদ থাকে চড়া। এ খাতের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিবেচিত সময়ে মন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

অতীতে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করায় কিছুটা সুবিধা পেলেও প্রথম দিন থেকেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখী তিনি। সবচেয়ে বেশি ভোগাতে পারে দেশের ভয়াবহ গ্যাস সংকট। চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও যখন সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না, তখন প্রতি দিনেই দেশীয় উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস কমে যাচ্ছে। শঙ্কার হচ্ছে চাইলেও ২ বছরের মধ্যে আমদানি বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই।

এক সময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৭৩১ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। সবচেয়ে শঙ্কার হচ্ছে দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার মজুদ ফুরিয়ে আসছে। দেশীয় উৎসের ৫০ শতাংশ যোগান আসছে ওই গ্যাস ফিল্ডটি থেকে। এক সময় ১৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ১৬ ফেব্রুয়ারি পাওয়া গেছে মাত্র ৮৩২ মিলিয়ন ঘনফুট। মজুদ কমে আসায় প্রতি দিনেই কমে আসছে উৎপাদন।

পেট্রোবাংলার প্রাক্কলন বলছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গ্যাসের চাহিদা ৪৫০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। যদিও কেউ কেউ বলতে চান এখনই গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা সাড়ে ৪ হাজারের বেশি। প্রতিশ্রুত গ্রাহকের চাহিদা ৫৫০০ মিলিয়নের উপরে হলেও ঘাটতি কম দেখাতে কৌশল হিসেবে চাহিদা কম দেখানো হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও অনুসন্ধান জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুততার সঙ্গে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন নির্মাণ এবং আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপন খুব জরুরি। ইতোমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর দেরি করলে সমুহ বিপদের শঙ্কা রয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে আমদানির পথে পা বাড়িয়েছিল আগের সরকার। এ জন্য ভোমরা-খুলনা এবং বেনাপোল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণ করে ভারত থেকে গ্যাস আমদানি, মহেশখালীতে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ), মোংলায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ও মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছিল।

বিশেষ বিধান আইনের আওতায় মহেশখালীতে এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। মোংলায় এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি চুড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। অন্তবর্তীকালীন সরকার দরপত্র ছাড়া দেওয়া ওই দুই প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছে।

এফএসআরইউ, ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন, এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প নিয়ে কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি করতে পারেনি অন্তবর্তীকালীন সরকার। যে কারণে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরেই মহা চ্যালেঞ্জের মূখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন কাজে ৫ বছরের ধাক্কা। একইভাবে এলএনজি টার্মিনালের করতে প্রয়োজন হবে ৮০মাসের বেশি। সংক্ষিপ্ত পথ এফএসআরইউ করতে গেলেও দরপত্র চুড়ান্তের পর কমপক্ষে ১৮ মাস লাগবে। অর্থাৎ ২০২৭ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানি বাড়ানোর কোন পথ খোলা নেই, দামের ইস্যু বাদ দিলেও।

শুধু এফএসআরইউ কিংবা এলএনজি টার্মিনাল হলেই আমদানি ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই। এলএনজি আমদানি বাড়াতে গেলে মহেশখালী থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে। ওই প্রকল্পের জন্য ২৪ হাজার কোটি টাকার খরচ প্রাক্কলন করা হয়েছে। সেটিও অনেক সময় সাপেক্ষ এবং অর্থায়ন জটিলতায় রয়েছে।

শুধু আমদানির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নয়, এলএনজি চড়া দামও বড় বাঁধা হিসেবে সামনে আসবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় উৎস থেকে মোট গ্যাসের গড় মূল্য পড়েছে ৩.৩৯ টাকা। আমদানিকৃত গ্যাসের গড়মূল্য পড়েছে ৬৮.৭১ টাকার মতো। বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়েও লোকসান সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

গ্যাস সংকটের এই ধাক্কা ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ খাতকেও জটিল করতে তুলেছে। পেট্রোবাংলা তথ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে ১৬ ফেব্রুয়ারি সরবরাহ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস ভিত্তিক ১২২০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ৫টি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে থাকার পর গ্যাস না থাকায় ৯টি (২৬৪৩ মেগাওয়াট) পুরোপুরি বন্ধ, ৫টিতে (৯৩৪ মেগাওয়াট) আংশিক উৎপাদনের তথ্য পাওয়া গেছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ চাহিদা হয়েছিল সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট, সেই চাহিদাই সরবরাহ করা যায়নি।

গরম ও সেচ একসঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর চাহিদা পৌঁছে যাবে ১৮ হাজারের উপর। একই সঙ্গে রমযানে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে চালানো হয় তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় অনেক। এখনই লোকসান সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা লোকসান রয়ে গেছে।

বিপিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা জানান , ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস দিয়ে উৎপাদনে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়েছে ৭.০৯ টাকা, কয়লায় ১৩.২০ টাকা, ফার্নেস অয়েলে ২৭.৩৯ টাকা, আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে ১৪.৮৬ টাকা, ভারত সরকারের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম পড়েছে ৮.৭১ টাকা এবং সৌর বিদ্যুতের দাম পড়েছে ১৫.৪৬ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ পড়ছে ১১.৮৩ টাকা, আর বিক্রি করছি ৬.৯৯ টাকায় (পাইকারি)। ওই অর্থবছরে ১ লাখ ১ হাজার ১৮৭ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। প্রতি ইউনিটে ৫.৯৯ টাকা হারে ঘাটতির কারণে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস দিয়ে ৪৪.০৯ শতাংশ, কয়লায় ২৬.৭২ শতাংশ, ফার্নেস অয়েলে ১০.৭৩ শতাংশ যোগান এসেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে পিডিবির লোকসান আরও বেড়ে যাবে। ঘাটতি কমাতে হলে পাইকারি দাম বাড়াতে হবে, তখন বিতরণ কোম্পানি খরচ বেড়ে যাবে। এখনই ঘাটতিতে রয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডসহ একাধিক বিতরণ কোম্পানি।

বিআইপিপিএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় (২০২৪ সালের জুনে) বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া ছিল ৪ মাসের বিলের সমান। বর্তমানে বকেয়ার পরিমাণ এখন ৮ থেকে ১০ মাসে গিয়ে ঠেকেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে বকেয়া কমিয়ে ৩ মাসে নামিয়ে এনেছিল এরপর আর বিল দেয়নি। মাঝে মাধ্যে ১০ দিন ১৫ দিনের করে বিল দিয়েছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বকেয়া বিল ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বকেয়ার কারণে ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক কোম্পানি ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে পারছে না। আমরা যদি তেল আমদানি করতে না পারি তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে কি করে। বিদেশি কোম্পানির বিল ঠিকই দেওয়া হয়েছে, অথচ আমরা দেশীয় উদ্যোক্তারা বকেয়া পাচ্ছি না। এটাকে চরম বৈষম্য বলা যেতে পারে।

বিআইপিপিএ’র সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, জুলাইয়ের পর থেকে বিল পরিশোধ কমিয়ে দেওয়া হয়। বিল না দিয়ে উল্টো তারা জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এটা ইচ্ছেকৃতভাবে করা হয়েছে, যাতে নতুন সরকারের সময় লোডশেডিং নিয়ে ঝামেলা তৈরি হয়। একই বিষয় নিয়ে বিদেশি ও দেশি বিদ্যুৎ কোম্পানির মধ্যে বৈষম্যে করা হচ্ছে।

বারাকা গ্রুপের চেয়ারম্যান ফয়সাল চৌধুরী বলেন, আমরা বিদেশে কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করেছি বিদ্যুতে। বকেয়ার কারণে ২ বছর ধরে কোন লভ্যাংশ দিতে পারছি না। নীল নকশার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের সঙ্গে বৈরি আচরণ করেছে। তারা নতুন সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।