বিগত আওয়ামীলীগ সরকার সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনে পদক্ষেপ গ্রহণ না করে জ্বালানি আমদানীতে জোর দিয়েছিল। এখাতে লুটপাট চালানোর জন্যই মুলত সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম থেকে অনেকটা দুরে ছিল বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ফলে বর্তমান জ্বালানির সংকটকালীন সম্ভাবনার সমুদ্রখাত কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সূত্র জানায়, সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগ পার হলেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও মায়ানমার যেখানে সমুদ্রে জ্বালানিসম্পদ আবিষ্কারে এগিয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশ দেড় দশক ধরে ব্যর্থতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি আহবান করা সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে। সাতটি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনলেও শেষ পর্যন্ত একটিও দরপত্র জমা দেয়নি। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহে অনিশ্চয়তায় সমুদ্রের তেল-গ্যাস সম্ভাবনা।
তবে আশার বানী হলো গত ১৮ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রস্তুত করা ‘উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি)-২০২৫’ পুনরায় পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে নতুন করে একটি কমিটি গঠন করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নির্দেশনায় এ-সংক্রান্ত একটি দাপ্তরিক আদেশ জারি করা হয়।
৯ সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিনকে। কমিটিতে রয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম তামিম, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল মনির মো. ফয়েজ উল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম মাইকেল কবির, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. সিনথিয়া ফরিদ, পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব, মহাব্যবস্থাপক হাসান মাহমুদুল ইসলাম, মেহেরুল হাসান এবং সদস্য সচিব ফারহানা শাওন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, এটি উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি। তারা মডেল পিএসসি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে। কমিটির কাজের পরিধি ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়েছে, তারা খসড়া পিএসসি-২০২৫ পর্যালোচনা করবে এবং ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। পেট্রোবাংলা কমিটিকে সচিবালয় ও লজিস্টিক সহায়তা দেবে। প্রয়োজনে কমিটি সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১১ মার্চ সমুদ্রের ২৪টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখায়নি। পরবর্তী সময়ে আগ্রহ না দেখানোর কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মতামত নেয় পেট্রোবাংলা। পাশাপাশি, মডেল পিএসসি-২০২৫ নতুনভাবে সংশোধনের জন্য পরামর্শক হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জিকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের লক্ষ্যে প্রায় এক যুগ পর গভীর সমুদ্র অঞ্চলে কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তাই আবারও মডেল চুক্তি সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সূত্র মতে, নতুন খসড়ায় গ্যাস বিক্রয়মূল্য, পাইপলাইন ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং কাজের শর্তাবলিতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আগে যা ছিল এইচএসএফও ভিত্তিক। পেমেন্টের ক্ষেত্রে লাইবরের পরিবর্তে সোফার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ডাটার মূল্য, ওয়ার্কার্স প্রফিট বোনাস ও কস্ট রিকভারি নীতিতেও সংশোধন আনা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, দরপত্র আহ্বানের আগে থেকেই একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি, যেমন এক্সনমবিল, শেভরন, পেট্রোনাস, টিজিএস অ্যান্ড স্লামবার্জার, ইনপেক্স, জোগম্যাক, সিনোক, ক্রিস এনার্জি এবং ওএনজিসি আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে সাতটি কোম্পানি দরপত্র সংগ্রহ করলেও নির্ধারিত সময়ে কেউ-ই তা জমা দেয়নি। এক্সনমবিল তাদের আপত্তি তুলে জানায়, গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন খরচে সঞ্চালন চার্জ না থাকা এবং ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
চীনা কোম্পানি সিএনওওসি জানায়, পেট্রোবাংলা ডাটা বিক্রির যে প্যাকেজ মূল্য নির্ধারণ করেছে, তা অতিমূল্যায়িত। একাধিক কোম্পানি গ্যাসের দাম কম থাকা নিয়েও আপত্তি তোলে। তারা জানায়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দাম মডেল পিএসসিতে রাখা হয়নি।
জ¦ালানী বিশেষজ্ঞরা বলছেন,বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ হারানোর পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ রয়েছে। প্রধান কয়েকটির মধ্যে তেল-গ্যাস উত্তোলনে কোম্পানির প্রফিট শেয়ার মার্জিন, জরিপের তথ্য-উপাত্তে ঘাটতি এবং তেল-গ্যাস কোম্পানির কর্মীদের প্রফিট ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) শেয়ারিং বিষয়গুলো উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ব্লকের ভূতাত্ত্বিক তথ্য (ডেটা) সংগ্রহের উচ্চমূল্য, গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত গ্যাস পরিবহনে অতিরিক্ত হুইলিং চার্জ এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সমুদ্রসীমায় মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলেও পরবর্তীতে তারা কাজ ছেড়ে চলে যায়। সর্বশেষ দুটি ব্লকে কাজ করা ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি বিদেশ ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের ব্যাংক গ্যারান্টি প্রত্যাহার করেছে পেট্রোবাংলা।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (উন্নয়ন-১) মোর্শেদা ফেরদৌস বলেন,আমরা মডেল পিএসসি-২০২৩-এ কিছু সংশোধন এনেছি। এছাড়া, স্টেকহোল্ডার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে আলোচনাও করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই আমরা সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনে দরপত্র আহ্বান করতে পারব।
জানা গেছে, বাংলাদেশে সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৮ সালে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে দুটি ব্লকের কাজ গ্রহণ করে কনোকো ফিলিপস কোম্পানি। তবে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় কোম্পানিটি কাজ ছেড়ে চলে যায়। এরপর ২০১৪ সালে চারটি ব্লকের মধ্যে দুটি ব্লকে কাজ শুরু করে ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি বিদেশ এবং বাকি দুটি ব্লকে কাজ শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস ও সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কোম্পানি। পরবর্তীতে সান্তোস কাজ ছেড়ে চলে যায়। এরপর ২০১৬ সালে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পস্কো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। কিন্তু তারাও কাজ ছেড়ে চলে যায়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রসীমায় স্থবির থাকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। সর্বশেষ আওয়ামী সরকারের আমলে গত বছরের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার শেষ সময়সীমা ছিল সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। কিন্তু কেউই দরপত্র জমা দেয়নি।
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে আগ্রহী করতে সর্বশেষ পিএসসি মডেল-২০২৩ বেশ সময় উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। ওই মডেলে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম নির্ধারণ না রেখে জ্বালানি তেলের দামের ১০ শতাংশ ধরা হয়। তেলের দাম বাড়লে গ্যাসের দামও বাড়বে, কমলে এটিও কমবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, পেট্রোবাংলা প্রাথমিকভাবে উত্থাপিত সব বিষয় নিয়ে বৈঠক করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধানের চেষ্টা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সমাধান করেছে। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দরপত্র জমা দিতে আগ্রহ দেখায়নি। মূল কারণ ছিল উচ্চ আর্থিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা, যার ফলে তারা পরিস্থিতি আরো পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছে।
ইজাজ হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে আবার দরপত্র আহবান করা হবে। ইতিবাচক দিক হলো, সাম্প্রতিক সংশোধনে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশি আকর্ষণীয়। তবে কাঠামোগত ছোটখাটো সমস্যা সমাধান করা গেলে ভবিষ্যতে এই খাতে ভালো বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন,সাতটি বিদেশী কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনেও কী কারণে এলো না, সেটি পর্যালোচনা করে দরপত্র পুনর্বিবেচনা করে আবারও প্রস্তুতির কাজ চলছে। এগুলো সময়মতো করা হয়নি এবং এলএনজি আমদানিকারক গোষ্ঠীর কাছে আমরা অনেকটাই জিম্মি হয়ে গিয়েছিলাম। যেটা আগে করার দরকার ছিল, সেটি আমরা সময়মতো করিনি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার ও ভারত করেছে। এখন যেসব বিদেশী কম্পানি দরপত্র কিনেও জমা দেয়নি তাদের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সের শুধু স্থলভাগে কূপ খননের সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অফশোর (সমুদ্রে) ড্রিলিংয়ের সক্ষমতা নেই। ফলে এ ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানির ওপর নির্ভর করতেই হবে। তাই অসংগতিগুলো সংশোধন করা উচিত।