চট্টগ্রামে এলপিজি (লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্টুরেন্ট মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। গ্যাসের এই তীব্র সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নি¤œ ও মধ্যমআয়ের মানুষ। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ক্ষেত্র-সবখানেই এখন গ্যাসের জন্য হাহাকার।
বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অধিকাংশ খুচরা দোকানে 'স্টক নেই' বোর্ড ঝুলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর অধিকাংশ খুচরা দোকানে বর্তমানে এলপিজি সিলিন্ডারের কোনো মজুত নেই। যেসব দোকানে অল্পসংখ্যক সিলিন্ডার আসছে, সেগুলো মুহূর্তেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তাও আবার নির্ধারিত মূল্যের অনেক ঊর্ধ্বে। ফলে দ্বিগুণ দাম দিয়েও অনেক গ্রাহককে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রেস্টুরেন্ট
খুচরা বাজারগুলোতে গ্যাসের সিলিন্ডার প্রায় নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কিছু দোকানে মজুত থাকলেও তা সাধারণের নাগালের বাইরে। এলপিজি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হোটেল-রেস্টুরেন্ট, চা দোকানি ও ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীরা। রান্নার গ্যাস না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ রাখছেন। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত খরচের ঝুঁকি নিয়ে কেরোসিন, কাঠ কিংবা অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন, যা একদিকে ব্যয়বহুল, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চা দোকানি হারুন বলেন, “আগে নির্ধারিত দামে গ্যাস পেতাম। এখন গ্যাসই পাওয়া যায় না। পেলেও এত দাম যে ব্যবসা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।”
অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ
ভোক্তাদের অভিযোগ, সংকটকে পুঁজি করে একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সংকটের সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে। প্রশাসনের তদারকি না থাকায় এই অনিয়ম দিন দিন বাড়ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ডিলারদের দাবি: কোম্পানি পর্যায়ে সরবরাহ সংকট
তবে এলপিজি ডিলাররা সংকটের দায় নিজেদের ওপর নিতে নারাজ। তাদের দাবি, মূল সমস্যা কোম্পানি পর্যায়ে। সময়মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় তারা খুচরা বাজারে গ্যাস দিতে পারছেন না। এক ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কাছে কোম্পানি থেকে গ্যাসই আসছে না। মজুত না থাকলে আমরা কীভাবে সরবরাহ দেব?” সংকটের মূল কারণ নিয়ে ডিলার এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে পরস্পরবিরোধী দাবি পাওয়া যাচ্ছে। আমদানিতে সমস্যা বা রিফিলিং স্টেশনে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাড়ছে ক্ষোভ ও দুর্ভোগ
দীর্ঘদিন ধরে চলমান এলপিজির এই সংকটে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং বা মূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কোনো ভূমিকা না থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় নগরজুড়ে ক্ষোভ ও দুর্ভোগ বাড়ছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোক্তারা অবিলম্বে বাজার তদারকি জোরদার, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে।
রাজশাহীতে এলপি গ্যাসের ভয়াবহ
সংকট ॥ সরবরাহ চাহিদার এক ভাগ
মহিব্বুল আরেফিন, রাজশাহী : রাজশাহীতে গত তিন সপ্তাহ ধরে এলপি গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে গৃহস্থালির রান্না থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ সবখানেই স্থবিরতা নেমে এসেছে। রাজশাহীতে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার এলপিজি সিলিন্ডারের প্রয়োজন। সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮ হাজার বা তার থেকেও কম সিলিন্ডার। ফলে সরকারী নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ মূল্য দিয়েও মিলছে না এলপি গ্যাস সিলিন্ডার।
রাজশাহী মহানগরীতে গত ৪ জানুয়ারি থেকে এলপিজি সংকট শুরু হয়। আর পরদিন ৫ জানুয়ারি সকাল থেকে বাড়তি দাম দিয়েও বাজারে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি। রাজশাহী মহানগরীর জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার ৮৬৭ জন এবং জেলার জনসংখ্যা ৩০ লাখ ২৩ হাজার ১৭৮ জন। মহানগরী ও জেলা মিলিয়ে মোট পরিবারের সংখ্যা ৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৫টি। এর মধ্যে মহানগরীতে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ রয়েছে মাত্র ৯ হাজার ১৫৭টি বাসাবাড়িতে। বাকি বিপুল সংখ্যক পরিবার সম্পূর্ণভাবে এলপিজি সিলিন্ডার নির্ভর। পাশাপাশি নগরীর প্রায় সব হোটেল ও রেস্তোরাঁয় এলপিজি সিলিন্ডার
ব্যবহার করা হয়। এদিকে রাজশাহীতে মোট ১৮টি কোম্পানি এলপিজি সরবরাহ করলেও বর্তমানে কার্যত সক্রিয় রয়েছে মাত্র ৪টি কোম্পানি। তবে বর্তমানে শুধুমাত্র এমবি, সান, যমুনা ও আই গ্যাস মিলে মোট ৪টি কোম্পানির সিলিন্ডার আসছে তাও
সীমিতভাবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতার কাছে সিলিন্ডারের মজুত
নেই বললেই চলে। কোথাও পাওয়া গেলেও তা কিনতে হ”েছ সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে। অনেক ক্ষেত্রে সিলিন্ডার পেতে দোকানিকে এক সপ্তাহ আগেই অর্ডার দিতে
হচ্ছে। নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, “৩ জানুয়ারি গ্যাস শেষ হয়। তিনটি বাজার ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি। দুই দিন পর ২ হাজার ৩৫০ টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার জোগাড় করতে হয়েছে। মাঝের দুই দিন রান্না হয়নি।” বালিয়াপুকুর
এলাকার এক বাসিন্দা জানান, পরিচিত ডেলিভারি কর্মী গ্যাস না থাকায় বেশি টাকা দিলে সাহেববাজার থেকে এনে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। “বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। এদিকে গতকালও বাজারের বিভিন্ন দোকানে সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ক্রেতারা ফেরত আসেন। এতে করে বাড়ির গৃহীনিরা চরম বিপাকে পড়েন। এছাড়া নগরীর হোটেল রেস্তোরাঁ গুলো পুরোটাই এলপিজি সিলিন্ডার নির্ভর। আর এলপিজি সংকটের বিরুপ প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়। হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, মাঝারি দোকান গুলোতে “প্রতিদিন চারটি বড় সিলিন্ডার লাগে। বড় সিলিন্ডার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তারা ছোট সিলিন্ডার দিয়ে কোনোমতে রান্না চালাচ্ছেন। আবার অনেক রেস্তোরাঁতে বিভিন্ন আইটেম বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।”
খুচরা গ্যাস বিক্রেতারা গ্যাস সংকটের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়মকে দায়ী করছে। তাদের মতে, “চাহিদার তুলনায় খুব কম সিলিন্ডার পাচ্ছেন। ফলে ক্রেতারা মনে করছেন তারা মজুত করছে। গ্রেটার রোড এলাকার বড় এজেন্সি মেসার্স হালিমার ব্যবস্থাপক পারভেজ হোসেন জানান, “আগে প্রতিদিনই ট্রাক আসত। এখন সপ্তাহে এক-দুই দিন আসে,
তাও অল্প পরিমাণে। ফলে কাউকেই চাহিদামতো গ্যাস দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।” তারা আরও বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সোয়া ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৫৩ টাকায়। জানুয়ারি থেকে সরকার নির্ধারিতভাবে দাম বেড়ে হয় ১ হাজার ৩০৬ টাকা।
“দাম বাড়ার পর থেকেই সরবরাহ আরও কমে গেছে। ডিলারদের একটি সূত্র বলছেন, গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই দাম বাড়বে এই অজুহাতে কোম্পানিগুলো সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনে, যা এখন আরও সংকুচিত হয়েছে। ওমেরা কোম্পানির পরিবেশক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, “আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যেত, এখন সপ্তাহে
মাত্র দুই দিন পাওয়া যাচ্ছে। আজ যা এসেছে, সবই বিক্রি হয়ে গেছে।” রাজশাহী এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী সমিতি জানায়, “রাজশাহীতে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা, অথচ সরবরাহ হচ্ছে পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এলপিজি সংকট কবে স্বাভাবিক হবেএ প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর দিতে পারছেন না কেউই। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় দ্রুত সরকারি তদারকি ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে রাজশাহীর রান্নাঘর ও খাদ্য ব্যবসা আরও বড় সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।