- সার কারখানায় সরবরাহ বন্ধ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত
- আলোকসজ্জা পরিহার ও ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমানোর নির্দেশনা
- স্পর্ট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে দফায় দফায় দরপত্র আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতে বৈশ্বিক অস্থিরতাই ধেয়ে আসা জ্বালানি সংকট নিয়ে ম্যারাথন উদ্যোগ নেয়া শুরু করেছে সরকার। জ্বালানি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বুধবার জরুরী পর্যালোচনা বৈঠক করেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
বৈঠকে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তবে সম্প্রতি ডিজেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সম্ভাব্য সাময়িক সংকট মোকাবেলায় জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে অনিবার্যভাবে দেশের জ্বালানি খাতেও সাময়িক সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়েরমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে গতকাল বুধবার জরুরী পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, বিপিসির চেয়ারম্যান, পিডিবির চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে জ্বালানি সংকট যাতে গভীর না হয় সেজন্য ম্যারাথন উদ্যোগ শুরু করেছে সরকার তারই অংশ হিসেবে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতে সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি, সার কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে বাংলাদেশের গ্যাস আমদানি ঝুঁকিতে থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোঃ এরফানুল হক।
সরবরাহ সংকটের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছে বলে পেট্রোবাংলা সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান আরও বলেছেন, বুধবার থেকেই সরবরাহ রেশনিং করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। হয়তো একটি সার কারখানা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, মার্চের ৪টি কার্গো ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ১৫ মার্চ এবং ১৮ মার্চের দু’টি কার্গো নিয়ে চিন্তায় আছি। আমরা কাতার গ্যাসকে চিঠি দিয়েছি তারা এখনও কোন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তারা ফিরতি চিঠিতে লিখেছে চুুক্তির জরুরি অবস্থার শর্ত যুক্ত হতে পারে। এতে আমরা বিকল্প চিন্তাও করতে পারছি না। যে কারণে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে আগামী ৭ দিনে ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট সাশ্রয় হবে।
পেট্রোবাংলার অপর একটি সুত্র বলেছেন, সার উৎপাদনে দৈনিক ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সেটি পুরোপুরি বন্ধ করার পাশাপাশি বিদ্যুতে ৮৭০ মিলিয়ন থেকে কমিয়ে ৮২০ মিলিয়ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, যেসব জাহাজ ১১ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশ পৌঁছার কথা, সেগুলো ইতোমধ্যেই হরমুজ অতিক্রম করেছে। জাহাজগুলো যথাক্রমে ৩, ৫ , ৯ এবং ১১ মার্চ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। হরমুজ অতিক্রম করা ৪ কার্গো এলএনজি দিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিনের সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব। মার্চে মোট ৯ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে কাতার থেকে ৬টি ও ২টি অস্ট্রেলিয়া থেকে আসার কথা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেছেন, মার্চে ৯টি, এপ্রিল ১১টি এবং মে মাসে ১১ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে ১৯ কার্গো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসার কথা। এক কার্গোতে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে। যা বাংলাদেশের একদিনের চাহিদার থেকেও কম। দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া কমবেশি ১৭১৪ মিলিয়নের সঙ্গে ৮০০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে মহেশখালীতে অবস্থিত ২টি ভাসমান টার্মিনালের। কাতার এবং ওমান থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে জাহাজ আসতে ৯ থেকে ১৩ দিন সময় প্রয়োজন হয়। এমনকি আমেরিকা ও অ্যাঙ্গোলা থেকে আমদানিকৃত এলএনজিও পানামা চ্যানেল দিয়ে হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে। এতে সময় প্রয়োজন হয় ২৫ দিনের মতো। বিকল্প রুট ভারতের মুম্বাই হয়ে আনা অনেক সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেছেন, স্পর্ট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য ৩ মার্চ দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোন দরদাতা পাওয়া যায়নি। ৪ মার্চ আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এদিকে বুধবার সচিবালয়ে জরুরী পর্যালোচনা সভা শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বর্তমান সংকট ঈদের ছুটি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। ছুটির সময়ে শিল্প-কারখানার কার্যক্রম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে, ফলে চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তবে সম্প্রতি ডিজেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
তিনি বলেন, হঠাৎ ডিজেল সেল বেড়ে গেছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারে দাম বেশি থাকায় কিছু পরিমাণ ডিজেল পাচার হয়ে যেতে পারে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; বৈশ্বিক বাজারে সবাই এখন জ্বালানি সংগ্রহে প্রতিযোগিতায় আছে। আমরা স্পট পারচেজেও গেছি, তবে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাই যতটুকু মজুত আছে, তা সাশ্রয় করে ব্যবহারের বিকল্প নেই।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সরকার নিয়মিত পর্যালোচনা করছে। প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রীকে বৈশ্বিক ও দেশীয় জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করা হচ্ছে। তবে আপাতত বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই বলেই তাঁর মূল্যায়ন।
মন্ত্রী বলেন, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টই এখন প্রধান কাজ। আমাদের হাতে যে সরবরাহ আছে, সেটাকে সাশ্রয়ীভাবে ব্যয় করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিগগিরই মন্ত্রণালয় থেকে বিস্তারিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলেও তিনি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইলেন মন্ত্রী
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের ঘটনায় সারা পৃথিবীতে জ্বালানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাংলাদেশেও সংকট দেখা দিয়েছে। যেগুলো কমিটমেন্ট ছিল, সেগুলো আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এইসব তথ্য জানিয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে ঢাকা সফরে আসা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
এ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলোচনা করে পল কাপুর বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী জানান, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান মজুত দিয়েই পরিস্থিতি সামলানোর পক্ষে হাঁটছে সরকার। তার কথায়, আমার হাতে যা আছে সেটাকে সাশ্রয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সাপ্লাই লাইন ঠিক না হয়।
তিনি বলেন, যা আছে সেটাকে সাশ্রয় করে ব্যবহার করতে হবে। দেশের মানুষ সহযোগিতা করলে এই ক্রাইসিস পার হয়ে যাওয়া সম্ভব। এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে শিগগিরই একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আলোকসজ্জা পরিহার ও ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার সীমিত করা :
সকল ধরণের আলোকসজ্জা পরিহার করা, ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে পাবলিক বাহন ব্যবহার, খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রয় না করাসহ একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। বুধবার মন্ত্রণালয়ের খবর বিজ্ঞপ্তিতে এমন তথ্য জানানো হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, খোলা বাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রি বন্ধে ব্যবসায়ীসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বর্ডারগার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য ইতোমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়াও, বৈশ্বিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার জন্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জ্বালানি সংগ্রহ স্বাভাবিক রাখতে সকল উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাময়িক সংকট মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগসমূহ সফল করার জন্য জনগণকে ধৈর্যধারণ করে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জ্বালানির সম্ভাব্য উৎসসমূহ হতে কাক্সিক্ষত পরিমাণে ও সঠিক সময়ে জ্বালানির সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে বর্তমান চাহিদা অনুসারে জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘœ ঘটতে পারে। সরবরাহ হ্রাস পেতে পারে, সাময়িক সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে। যার প্রভাবে বিদ্যুৎ ও সারের উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে পবিত্র মাহে রমজানে যাতে জনদুর্ভোগ না হয় সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনে নি¤েœাক্ত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।