দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে নবায়নযোগ্য বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণের ভিত্তি তৈরিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে গতকাল সোমবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এ মন্তব্য করা হয়।

অনুষ্ঠানে নাগরিক সমাজ, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে খসড়া ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) ২০২৫’ সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানোর জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। মানববন্ধনে আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস উপলক্ষ্যে টিআইবির ধারণাপত্র পাঠ করেন সংস্থাটির এনার্জি গভর্নেন্স বিভাগের সহসমন্বয়ক আশনা ইসলাম।মানববন্ধন থেকে টিআইবি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে।

কর্মসূচিতে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, সিপিডি, ক্যাব, বাপা, বিএসআরইএ, বিজিইএফসহ বিভিন্ন নাগরিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনার্জি গভর্নেন্স বিভাগের সমন্বয়ক নেওয়াজুল মওলা।

মানববন্ধনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার এমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি, যা পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার এগিয়ে নিতে পারত। কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ভিত্তি তৈরি করা হলো না, সে প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ‘থ্রি জিরো’ –শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ– এই তিন লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় পর্যায়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জনগণকে শ্বেতপত্রের মাধ্যমে অবহিত করা সরকারের দায়িত্ব। অথচ জ্বালানি মাস্টার প্ল্যানের খসড়ায় এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর কৌশলই প্রাধান্য পাচ্ছে, যা জলবায়ু ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কার্বন দূষণজনিত জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জনগণের অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এ বিষয়টি আদৌ গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে প্রণীত জ্বালানি মাস্টার প্ল্যানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির ঝুঁকি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫সহ সব নীতি ও পরিকল্পনায় অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিবেশ ছাড়পত্র প্রদানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জ্বালানি খাতে দেশি-বিদেশি সব চুক্তি ও প্রকল্প নথি প্রকাশ এবং নেট মিটারিং সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সহজীকরণ ও ফিড-ইন ট্যারিফ কার্যকর করা।

টিআইবি জানায়, গত বছর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস উদযাপন করা হয়। এ বছরও দিবসটি উপলক্ষ্যে দেশের ৪৫টি জেলা ও উপজেলায় সচেতনতা কার্যক্রম, মানববন্ধন, পথসভা ও আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের ‘থ্রি জিরো’ উদ্যোগের (শূন্য দারিদ্র, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ) আঙ্গিকে জাতীয়ভাবে কী করা হয়েছে সে সম্পর্কে সরকারের উচিত শ্বেতপত্রের মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করা।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণের ভিত্তি তৈরিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যা পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো। কেন তা হলো না, এই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এমন অবহেলা আশা করা যায় না, কারণ এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের বিষয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন তারা আদৌ কার্বন-দূষণজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদেশের জনগণের অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভেবেছেন কী-না?

অন্তর্বর্তী সরকার অংশীজনকে সম্পৃক্ত না করেই জ্বালানি মাস্টার প্ল্যানের যে খসড়া প্রণয়ন করেছে সেখানে সার্বিকভাবে, জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম-সহায়ক নীতি করায়ত্ত,স্বার্থের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিসহ সুশাসনের ঘাটতি অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ঝুঁকি রয়েছে।

নাগরিক সমাজ, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি খসড়া “এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) ২০২৫” সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানান তারা।