কামাল উদ্দিন সুমন

ভোলার গ্যাস দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আকারে আনতে চায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ওই এলএনজির দাম পরিবহন খরচসহ ৪৭ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করেছে।

জ্বালানি বিভাগ প্রস্তাবিত দরের বিষয়ে আগামী ২৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সভায় উঠছে। গতকাল শনিবার দৈনিক সংগ্রামকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি জানান, মঙ্গলবার কমিশনের সভা রযেছে। সেখানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের দেয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিগত সরকারের নির্বাহী আদেশে দেওয়া সিএনজির মতো প্রতি ঘনমিটার ৪৭ দশমিক ৫০ টাকা করতে চায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

জানা গেছে,

বিগত সরকারের সময়ে একটি চুক্তির আওতায় দৈনিক ৫ মিলিয়ন গ্যাস সিএনজি আকারে আনছে একটি দেশীয় কোম্পানি। নির্বাহী আদেশে ওই গ্যাসের দাম ১৭ টাকা এবং পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাবদ ৩০ দশমিক ৫০ টাকাসহ ৪৭ দশমিক ৫০ টাকা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। ওই কোম্পানিটি ১৭ টাকা দিয়ে কিনে সাড়ে ৪৭ টাকায় বিক্রি করছে। ২০২৩ সালের ৮ মে প্রকাশিত ওই গেজেট সংশোধন করে এলএনজি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন পরিবর্তনের কারণে যেহেতু নির্বাহী আদেশে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করার সুযোগ নেই, তাই বিইআরসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ বলেছে, ৩০ মিলিয়ন গ্যাস এলএনজি আকারে নদীপথে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নদীপথে এনে ঢাকা ও ঢাকার পার্শ¦বর্তী এলাকায় শিল্প কারখানায় সরবরাহ করা হবে। যে কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তারা ভোলা থেকে কিনে নির্ধারিত দরে আগ্রহী শিল্প কারখানায় সরবরাহ করবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা শিপ অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ঢাকা, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারী ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চাংকিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং জিসিজি এলএনজি পরিবহনের কাজ পেতে প্রস্তাব জমা দেয়। অন্যদিকে তিতাস গ্যাসের অধিভুক্ত এলাকায় ৩২টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হিসেবে তালিকা পাওয়া গেছে। যাদের মোট গ্যাসের চাহিদা ১৫ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তারা ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। কোম্পানিগুলো সর্বোনি¤œ ১২ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২৪ মাসের মধ্যে সরবরাহ শুরুর কথা বলেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে সরবরাহ ব্যহত না হয়, সে জন্য উভয় প্রান্তে ৫ দিনের এলএনজি মজুদ করার জন্য স্টোরেজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে গ্যাস ফিল্ডের নিরাপত্তার জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

দেশে চলছে ভয়াবহ গ্যাস সংকট, এলএনজি আমদানি করেও ঘাটতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তেমন সময়ে দ্বীপ জেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস পড়ে রয়েছে চাহিদা না থাকায়। দৈনিক মাত্র ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, আবার পাইপলাইন না থাকায় জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাচ্ছে না। বিগত সরকার সিএনজি আকারে ৫ মিলিয়ন আনার জন্য একটি কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে। কোম্পানিটি দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ মিলিয়ন পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দিয়েছে গাজীপুর এলাকার কয়েকটি কারখানায়।

অন্যদিকে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস আনতে পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়ে কয়েক দশক ধরেই আলোচনা চলে আসছে। ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইনের পরিকল্পনা থাকলেও রুট পরিবর্তন করে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা করা হয়েছে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে, বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। বলা যায় অর্থায়ন ইস্যু নিয়েই বিষয়টি ঝুলে রয়েছে এতোদিন। ৭ হাজার কোটি টাকার জন্য যখন পাইপলাইন আটকা, তখন এক কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে ৬৪৯ কোটি টাকা (আগস্টের দরপত্র)। যা দেশের ১ দিনের সরবরাহের (৩০০০ মিলিয়ন) সমান।

দ্বীপজেলা ভোলাতে ৩টি গ্যাস ফিল্ড আবিস্কৃত হয়েছে। ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে, যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা না থাকায় মাত্র ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট (১৪ নভেম্বর ২০২৫) উত্তোলন করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। পাইপলাইন বাস্তবায়ন ও প্রস্তাবিত কূপগুলো খনন শেষ করলে সেখান থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব মনে করছে বাপেক্স।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান,বিষয়টি একেবারেই নতুন, অনেক দিক বিবেচনা করতে হচ্ছে। কমিশন এখনও কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি। আমাদের টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে, তারা একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে। তবে জ্বালানি বিভাগের দেওয়া প্রস্তাবে তথ্যগত ঘাটতি রয়েছে। তাদের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি কমিশনের সভায় উঠবে আগামী সপ্তাহে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগে আইনগত দিক যাচাই-বাছাই করা হবে। তবে আমার মনে হয়, কমিশন যদি দর স্থির করে না দেয়, সে ক্ষেত্রে গণশুনানির ছাড়াও সুযোগ রয়েছে।