* ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন
* পেট্রোল পাম্পে নিয়োগ হচ্ছে ট্যাগ অফিসার
অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেলের মজুদ রোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশের ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করেছে সরকার । গতকাল শনিবার বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলামের সই করা এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে এবং মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেল মজুদের অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এসব অপচেষ্টা প্রতিরোধ, জ্বালানি তেল বিপণনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে মোতায়েন কার্যক্রম সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইউনিট সদর থেকে দূরবর্তী এলাকায় দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে নিরাপদ স্থানে অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা জেলায় ১টি, কুড়িগ্রামে ২টি, রংপুরে ৩টি, রাজশাহীতে ৩টি, সিলেটে ২টি, মৌলভীবাজারে ৩টি, কুমিল্লায় ৩টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১টি এবং সুনামগঞ্জে ১টি ডিপোসহ মোট ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় বার্তায়।
মোতায়েনকৃত সদস্যরা অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত তদারকি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করছেন। যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, অবৈধ জ্বালানি মজুদ ও বিক্রয় প্রতিরোধ এবং নাশকতা ঠেকাতে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
দায়িত্বাধীন ডিপো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিজিবির দৃশ্যমান উপস্থিতির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জনমনে আস্থা বৃদ্ধিতে কাজ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
এছাড়া সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার প্রতিরোধে অতিরিক্ত টহল, নৌ টহল জোরদার, চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইসিপি ও এলসিপিগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবহৃত ট্রাক-লরিসহ বিভিন্ন যানবাহনে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
দেশের সব পেট্রোল পাম্পে নিয়োগ হচ্ছে ট্যাগ অফিসার
চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে দেশে সব পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।
শনিবার এক বার্তায় মন্ত্রণালয় জানায়, শুক্রবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সিদ্ধান্তে বলা হয়, দেশের সব পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করতে হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বিপিসি ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা ব্যতীত জেলা ও বিভাগীয় শহরে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা ও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তাদের অধিক্ষেত্রাধীন প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করবেন। ট্যাগ অফিসাররা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ/বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করবেন ও দৈনিক প্রতিবেদন দেবেন।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগপূর্বক জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে তথ্য পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর/সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সরকারি ডিপো থেকে জ্বালানি তেল বিপণনের নতুন সময়সূচি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারি ডিপো থেকে জ্বালানি তেল বিপণনের সময় পরিবর্তন করেছে। শনিবার বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সেই প্রেক্ষিতে, দেশব্যাপী বিদ্যমান ফিলিং স্টেশন, প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ও পাম্পগুলোতে জ্বালানি পণ্য সঠিকভাবে সরবরাহ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে বিপিএসির অধীন কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা বা ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহের জন্য নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান স্থাপনা বা ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ৭টায়। আর প্রধান স্থাপনা বা ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম শেষ হবে বিকাল ৩টায়। এর আগে সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত তেল নিতে পারতেন ডিলাররা।
তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো আশঙ্কা নেই: জ্বালানি বিভাগ
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে। আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ক্রয় করবেন না। আতঙ্ক নয়, সচেতন হতে হবে।
পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ উল্লেখ করে জ্বালানি বিভাগ আরও জানায়, এ ধরনের জ্বালানি তেল মজুত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই, অবৈধ জ্বালানি তেল মজুত করবেন না। নিজে সাবধান হওয়ার পাশাপাশি অন্যকেও সাবধান করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতিটি জেলায় বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট সক্রিয় আছে। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতকে না বলুন।
সরকার এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি জানিয়ে আরও বলা হয়, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক বাজার হতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ক্রয় করছে। তাই জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই অতিরিক্ত লাভের আশায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত করবেন না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পাম্পের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষা আর কত?
ইরানে হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে গত কয়েকদিনে। ঈদের ছুটি শেষ। এর আগে থেকেই জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগেই ছিল। ছুটি শেষে কর্মজীবী লোকজন ঢাকায় ফেরায় বেড়েছে কর্মব্যস্ততা, বেড়েছে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা। শনিবার সকাল থেকেই পাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে।
রাজধানীতে দিন কিংবা রাত সবসময় পাম্পগুলোর সামনে থাকছে যানবাহনের এমন দীর্ঘ সারি। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানী বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটা পাম্পের সামনেই তেল নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তেল নিতে আসা যানবাহন আর চালকদের তেলের অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। কেউ কেউ নিজেদের গাড়ির ওপরই বসে আছেন। কেউ আবার গাড়ি লাইনে রেখে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তেল নিতে আসা যানবাহন চালকদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে আক্ষেপ করে বলছেন, ‘জ্বালানি জন্য অপেক্ষা আর কত?’
দেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে : জ্বালানিমন্ত্রী
দেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে, তবে কালোবাজারিরা তেল মজুত করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। শুক্রবার সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদে ৬৮ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুকেন্দ্র পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হতো, এখনো একই পরিমাণ সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা তেল বিক্রি হতে এক থেকে দেড় দিন সময় লাগত। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন সেই তেল দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অবৈধ তেল কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন
জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে কয়েকটি জেলায় তেল মজুতের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের জরিমানার পাশাপাশি কারাদ-ও দিয়েছেন। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে সড়কও অবরোধ করা হয়েছে।
জামালপুর জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার জামগড়া মোড় এলাকায় মুদিদোকানি শাহজালালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩৭০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় শাহজালালকে পাওয়া যায়নি। মজুত করা জ্বালানি তেল পরবর্তী সময়ে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজারে অভিযান চালিয়ে ৮০০ লিটার পেট্রল জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব তেল লাইসেন্স ছাড়া অতিরিক্ত মূল্যে খুচরা বিক্রি করার সত্যতা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এনায়েতুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ধর্মপুর নীরাবল এলাকায় রাতের আঁধারে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করায় শাহিনুর ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণকে দুই হাজার টাকা জরিমানা ও পাঁচ দিনের কারাদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জামালপুর শহরের জুই এন্টারপ্রাইজ নামের জ্বালানি তেলের একটি দোকানে তেল বিক্রি না করার ক্ষোভে সড়ক অবরোধ করেছেন মোটরসাইকেলের চালকেরা। পরে স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দোকানে তেলের মজুত পায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি শুরু করায়। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ওই দোকানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় একটি গোয়ালঘর থেকে ড্রামভর্তি পেট্রল জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়নে অভিযানটি পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফিউর রহমান।