# ১৫ মাস পরে ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু
# তেলের দাম নির্ধারনে বিইআরসির গণশুনানী ২৯ জানুয়ারি
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম ইচ্ছেমতো নেয়ার ফলে বছরে ১হাজার ১৫২ কেিিট টাকা বেশি খরচ হচ্ছে পিডিবির। আওয়ামীলীগ সরকারের সময় ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারন করা ছিল না।
কোন ধরনের গণশুনানী ছাড়াই তখন ইচ্ছে মতো দাম নির্ধারণ করতো বিপিসি। বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে আসছে। এতে করে খরচ বেড়েছে পিডিবির। আর এখরচের বোঝা পরোক্ষভাবে গ্রাহকের উপরই চেপেছে।
তবে প্রত্যাশার খবর হলো অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা পাওয়ার ১৫ মাস পরে ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আইনি প্রক্রিয়া গণশুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ জানুয়ারি। বিইআরসির শুনানি কক্ষে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণশুনানিতে অংশ নিতে চাইলে ২২ জানুয়ারির মধ্যে লিখিত আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম দৈনিক সংগ্রামকে জানান,বিপিসি একই সঙ্গে বিক্রেতা তারাই আবার দাম নির্ধারণ করে। এতে জবাবদিহিতা থাকে না,ভোক্তাদের অংশগ্রহণ থাকে না। বিইআরসিতে এলে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি সামনে চলে আসে। এতে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হয়।
সূত্র জানায়, প্রতি লিটার ফার্নেস তেলে ৭০ টাকা খরচ পড়ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। একই তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরবরাহ করছে ৮৬ টাকা দরে। অর্থাৎ প্রতি লিটারে ১৬ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। প্রতি মাসে গড়ে ৬০ হাজার টন ফার্নেস তেল নিচ্ছে পিডিবি। এতে পিডিবির বাড়তি খরচ হচ্ছে ৯৬ কোটি টাকা। অঙ্কটি বছরে ১হাজার ১৫২ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
সূত্র জানায় , সর্বশেষ গত বছরের ২ আগস্ট ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণ করে বিপিসি। এরপর গত এক বছরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে তা সমন্বয় করা হয়নি। বিপিসি সূত্র বলছে, গত বছরের জানুয়ারিতে প্রতি টন ফার্নেস তেলের দাম ছিল ৪৮৬ ডলার। এখন তা কমে হয়েছে ৩৭৩ ডলার। এর মানে গত ১০ মাসেই বিশ্ববাজারে দাম কমেছে ২৩ শতাংশ, অথচ দেশে কমানো হয়নি।
জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি গেছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। এ বছরও বিদ্যুৎ খরচ কমাতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। একদিকে পিডিবির কাছে তেল বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা করছে সরকারি সংস্থা বিপিসি; অন্যদিকে সরকারি আরেক সংস্থা পিডিবিকে নিয়মিত ভর্তুকি দিতে পারছে না সরকার। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি।
সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে এসেছে। অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৫ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফার্নেস অয়েল এবং জেট এ-১ এর দাম নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির উপর ন্যস্ত করে।
প্রজ্ঞাপনের পর ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণের প্রস্তাব জমা দেয় বিপিসি। ওই প্রস্তাবের পর শুধু জেট ফুয়েলের দামের গণশুনানি করে মে মাসে জেট ফুয়েলের দাম ঘোষণা করেছে বিইআরসি। এরপর প্রতিমাসে জেট ফুয়েলের দর সমন্বয় করা হচ্ছে। কিন্তু বিপিসি লাইসেন্স গ্রহণ করলেও ২০১২ সালের পর আর বিইআরসির লাইসেন্স নবায়ন করেনি। যে কারণে ফার্নেস অয়েলের দামের গণশুনানি ঝুলে যায়।
সূত্র বলছে, চাহিদার দিক থেকে ডিজেলের পরেই রয়েছে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার। এই জ্বালানির সবচেয়ে বড় গ্রাহক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯১২ মে. টন বিক্রয় হয়েছে। এরমধ্যে ইআরএল থেকে পরিশোধনের মাধ্যমে ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ, অবশিষ্ট ৬৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে।
অন্তবর্তীকালীন সরকার বিগত সরকারের আমলে করা ২০২৩ সালের সংশোধনী বাতিল করে দিলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দর ঘোষণার একক এখতিয়ার ফিরে পেয়েছে বিইআরসি। তবে আগের মতোই এখনও নির্বাহী আদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা” প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সরকার। ওই ফর্মুলা অনুযায়ী প্রতিমাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় করার কথা। গেজেট অনুযায়ী বিপিসি ও অন্যদের কমিশন অপরিবর্তিত থাকছে শুধু আমদানি মূল্যের তারতম্য সমন্বয় করা হচ্ছে।
পিডিবি ও বিপিসি সূত্র বলছে, গত বছর বিপিসির কাছ থেকে ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৫১২ টন ফার্নেস তেল নিয়েছিল পিডিবি। এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৫৮ টন। এর মানে বছরের ৯ মাসে পিডিবি মোট ফার্নেস তেল নিয়েছে ৫৭ কোটি ২৫ লাখ ৫৮ হাজার লিটার। পুরোটা সময়ই বাড়তি দাম শোধ করে আসছে পিডিবি। বাকি ৩ মাসে আরও ১৩ কোটি লিটার ফার্নেস তেল সরবরাহের কথা রয়েছে। দাম না কমালে পিডিবিকে ৩ মাসেই বাড়তি দিতে হবে ২০৮ কোটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) মূল স্থাপনা ও ডিপোগুলোতে বর্তমানে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৫৫ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর ফার্নেস অয়েলের মজুত ছিল ৯৪ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ৫২ হাজার টন স্টোরেজ সক্ষমতার মধ্যে ৪৩ হাজার ২৭৫ টন, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও এসএওসিএলের পতেঙ্গা প্রধান ডিপোতে ৩৩ হাজার ১ টন স্টোরেজ সক্ষমতার মধ্যে ২৭ হাজার ৮৪৮ টন, মংলায় ৭ হাজার ৩২০ টনের মধ্যে ১ হাজার ৪২৭ টন ফার্নেস অয়েল রয়েছে।
পাশাপাশি গোদনাইল ডিপোতে ৫ হাজার ১৩৭ টনের মধ্যে ৪ হাজার ১১৯ টন, তাছাড়া অয়েল ট্যাংকারযোগে ওই ডিপোতে যাওয়ার পথে রয়েছে ২ হাজার ৯০৭ টন ফার্নেস অয়েল। ফতুল্লা ডিপোতে ফার্নেস অয়েল রাখার ট্যাংক না থাকলেও ডিপোর সার্ভিস ট্যাংকে রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৭৭৭ টন। অন্যদিকে, দৌলতপুর ডিপোতে ১০ হাজার ৪৯৭ টন স্টোরেজ সক্ষমতার মধ্যে ১০ হাজার ৪৭১ টন ফার্নেস অয়েল রয়েছে।
বিপিসি বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত) ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৭৪ টন ফার্নেস অয়েলের চাহিদার বিপরীতে পিডিবি নিয়েছে তিন লাখ ৭৬ হাজার ৫৬৪ টন। তবে শেষ ছয় মাসের সংশোধিত চাহিদা দিলেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর দুই মাসে চাহিদার চেয়ে ২৫ হাজার টন বেশি নিয়েছে পিডিবি। আবার নভেম্বর মাসে ৪৫ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে নিয়েছে ২৯ হাজার ৮১৮ টন এবং ডিসেম্বর মাসের ৩৫ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে প্রথম ১৪ দিনে নিয়েছে মাত্র দুই হাজার ৯৬০ টন।