অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০) অবিলম্বে স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল রবিবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জনসম্পৃক্ততা উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং ক্লিন, বেলা, সিইপিআর, এমজেএফ, লিড, ইটিআই বাংলাদেশসহ একাধিক সংগঠনের সহ-আয়োজনে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মূল বক্তব্যে ক্লিন-এর নেটওয়ার্ক অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ। বিপরীতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং ২০৫০ সালেও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর ৫০ শতাংশ নির্ভরতা বজায় রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। প্রস্তাবিত হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া ও কার্বন ক্যাপচারের মতো প্রযুক্তিকে তিনি ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক আখ্যা দেন।

বিডব্লিউজিইডির সদস্যসচিব হাসান মেহেদী বলেন, জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের অস্বচ্ছ নীতি প্রণয়নের পুনরাবৃত্তি।

মনোয়ার মোস্তফা বলেন, অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে যেভাবে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে। তার মতে, দেশের বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ৪০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হওয়ার কথা নয়, অথচ পরিকল্পনায় তা অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে এবং জনগণকে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বাড়তি আর্থিক বোঝা বহন করতে হবে।

তিনি বলেন, মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ। পরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৫০ সাল পর্যন্ত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ নির্ভরতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এতে ওই সময় পর্যন্ত প্রায় ১৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানির চাপ তৈরি হবে, যা অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।

বিডব্লিউজিইডির সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, খসড়া এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনসাধারণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনথি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আগের সরকারের অস্বচ্ছ নীতি প্রণয়নের পুনরাবৃত্তি।

লিডের গবেষণা পরিচালক শিমনউজ্জামান বলেন, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করে আবারও আইইপিএমপি ২০২৩-এর মতো একটি বিতর্কিত মহাপরিকল্পনা আনার উদ্যোগ হতাশাজনক। ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) মুনীর উদ্দীন শামীম বলেন, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং এটি এগিয়ে গেলে রপ্তানি খাত গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।