জ্বালানি সংকটে বদলায়নি পেট্রোল পাম্পের চিত্র। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে দেখা যায় চালকদের। তবে কিছু এলাকার পাম্প বন্ধ থাকায় ভোগান্তির অভিযোগ করেন ক্রেতারা। বিভিন্ন জেলায় অনেক পেট্রোলপাম্প বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। তেল সংকটে পাম্প বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে অনেক স্থানে । জ¦ালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার ৩ মাসের একটা জ¦ালানি মজুত (বাফার স্টক) নিশ্চিত করতে যাচ্ছে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা বলছে, জ¦ালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশংকা থেকে অনেকে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। আবার কেউ কেউ তেল কালোবাজারি করার চিন্তা থেকেও এমনটা করছেন বলে তাদের দাবী। তবে ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার দাবি পাম্প মালিকদের। খোজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন পাম্পের সামনে শতাধিক গাড়ি-মোটরসাইকেলের লাইন। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ তেলের মজুত। গেট বন্ধ করা নিয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়ান অপেক্ষমাণ চালকরা। তেল সংকটে পাম্পের লোকজনের সঙ্গে ক্রেতার দ্বন্দ্ব এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র। ভোগান্তিতে দীর্ঘশ্বাস চালকদের।
তেল নিতে আসা গ্রাহকরা জানান, সরকার বলেছে তেলের মজুদ আছে তাহলে এখন তেল পাচ্ছি না কেন? রাইড শেয়ার করে চলতে হয়, এখন বাসায় না খেয়ে থাকতে হবে। গতকাল ছুটির দিনে ডিপো বন্ধ থাকায় নতুন মজুত আসছে না। ফলে চাপ পড়ছে খোলা থাকা ফিলিং স্টেশনে। সকাল থেকে দীর্ঘ অপেক্ষা।
ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় কম তেল পাওয়ার অভিযোগ পাম্প মালিকদের। অন্যদিকে গ্রাহকরা অভিযোগ জানিয়ে বলেন, দেড় ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর এখন বলছে তেল নেই। গেট বন্ধ করে দিয়েছে এরইমধ্যে। সরকারের দাবি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। তবু কেন এমন ভোগান্তি, সেই প্রশ্নই ক্রেতাদের।
জানা গেছে, ছুটির দিনেও রাজধানীর পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে যানবাহনের মালিক ও চালকদের। একদিকে ছুটির কারণে ডিপো বন্ধ, অন্যদিকে সরবরাহ কম থাকায় রাজধানীর অনেক পাম্প আজও তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মিরপুর, ধানমন্ডি, শাহবাগ, বাংলামোটর ও প্রগতি সরণিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন। ফলে চালকরা অনেক সময় রাস্তার মাঝেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছেন।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তেলের অনেক পাম্পে আজও তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইন দেখা গেছে। কিছু কিছু এলাকায় পেট্রোল পাম্পের ভিড়ের ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে।অনেকে কয়েক ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষমাণ থাকার পর তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, এই সুযোগে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে এক শ্রেণীর অসাধু পাম্প কর্মী।
রাজধানী ঢাকাতেই কোনো কোনো পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখারও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ট্রাফিক সংক্রান্ত ফেসবুক গ্রুপগুলোতে। ঢাকার বাইরে মহাসড়কগুলোর পাশে থাকা পেট্রল পাম্পগুলোর অনেকগুলোতে গত দুদিন তেল বিক্রি বন্ধ থাকার অভিযোগ করছেন অনেকে। যদিও অভিযোগ উঠছে যে কিছু পেট্রল পাম্পের মালিক তেলের দাম বাড়তে পারে- এই চিন্তা থেকে তেল বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে। আবার পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগও জোরদার হচ্ছে।
গত কয়েক দিনের তুলনায় লাইন কিছুটা কমলেও অনেক পাম্পে এখনও অপেক্ষার সময় দীর্ঘ। চালকরা জানিয়েছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় কাক্সিক্ষত পরিমাণ তেল পাওয়া যায় না। এতে দিনের বেশির ভাগ সময়ই তেল নেয়ার কাজে চলে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, পাম্পে যে তেল আগে দুদিন চলতো এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই তেল যায় কোথায়? তেল নিয়ে কাউকে তেলেসমাতি করতে দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাকে পেট্রল পাম্প এবং পেট্রল ডিপো পাহারা দেওয়া লাগে যাতে চুরি না হয়। তারপরও চুরি হচ্ছে, কারণ মানুষের চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে।
এদিকে পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ডিপো থেকে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম আসছে। এছাড়া সম্ভাব্য দাম বৃদ্ধি কিংবা ভবিষ্যতের সংকটের আশঙ্কায় অনেক চালক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের জের ধরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পেট্রল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকট চোখে পড়লেও সরকার বলছে, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে পারলে’ বাংলাদেশকে সংকট স্পর্শ করতে পারবে না। একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকায় এখনই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো চিন্তা সরকারের নেই।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, তেলের কোনো সংকট নেই এবং এরপরেও সরকার তিন মাসের জন্য জ্বালানি মজুত (বাফার স্টক) নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, যুদ্ধ পরিস্থিতির অস্থিরতার সুযোগে একটি গোষ্ঠী মজুতদারি ও কালোবাজারি শুরু করেছে। তিনি জানান, এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪শে মার্চ দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার মে. টন। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেন ছিল ২৬ হাজার টন। এর বিপরীতে বাংলাদেশে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক পেট্রোল ১৪০০ টন, অকটেন ১২০০ টন এবং ডিজেলের চাহিদা থাকে প্রায় ১২ হাজার টনের মতো।
মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসজুড়ে তেলবাহী যত জাহাজ এসেছে এবং আরও যে কয়টি ইতোমধ্যেই নিরাপদ জোনে এসে পোৗঁছেছে সেগুলো ঠিকমতো বন্দরে এসে পৌঁছালে এপ্রিল মাসেও জ্বালানি নিয়ে কোনো সংকট হবে না বলে সরকার আশা করছে। এর মধ্যে ৭৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটা জাহাজ বাংলাদেশের পথে রয়েছে। সেটি এলে ডিজেল সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দূর হবে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনি একটি ত্রিশ হাজার টনের তেলবাহী জাহাজের পেছনে সরকারকে বাড়তি প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। সরকার এখন লিটার প্রতি ৬০ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছে। তেল ও গ্যাসের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি আছে তারা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চুক্তি মোতাবেক দামে সরবরাহ করতে পারবে না বলে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে সংকট মোকাবেলায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দাম দিয়ে তেল ও এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, তিন মাসের জন্য জ্বালানি তেলের একটি মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে দ্রুতগতিতে এবং এর ফলে আগামী কয়েক মাস জ্বালানি খাত সংকটমুক্ত থাকতে পারবে বলে আশা করছেন তিনি।
যদিও কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী তেলের মজুতদারি ও কালোবাজারি শুরু করায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে সংকট দেখা যাচ্ছে। তারা বলছেন, যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ তেল দিয়ে একটি পেট্রোল পাম্প অন্তত দুই দিন চলতো এখন সেখানে দিনে ২/৩ লড়ি তেল সরবরাহ করতে হচ্ছে। মূলত পেট্রোল পাম্প থেকে তেল কালোবাজারি কিংবা মজুতদারি হচ্ছে কি-না সেই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। আবার সরকার বিভিন্ন অজুহাতে আরও সংকট তৈরি করা হতে পারে আশংকা থেকে এসব পাম্পের বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
জ্বালানি মন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, এসব অভিযোগ সত্যি কি-না তা দেখতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, জনসাধারণ আগের মতো স্বাভাবিকভাবে তেল ক্রয় করলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং পেট্রোল পাম্পে কোনো লাইন দেখা যাবে না।
এদিকে জ্বালানি তেলের চলমান সংকট ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন জেলায় মোটরসাইকেলের জন্য তেল সরবরাহে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে জেলা প্রশাসনের সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত নির্ধারিত ‘ফুয়েল কার্ড’ এবং বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলে জ্বালানি তেল দেওয়া হবে না।
সূত্র জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাসবোঝাই ২৫টি জাহাজ নোঙর করেছে চট্টগ্রাম বন্দরে। পাইপলাইনে আছে আরও পাঁচটি। সামনের পাঁচ দিনে এসব জাহাজ বন্দরে নোঙর করলেও মার্চেই ঘাটতি থাকবে চাহিদার অর্ধেক। বিকল্প উৎস থেকে আমদানির পাশাপাশি বর্তমান মজুত দিয়ে মার্চে কোনো রকম সামাল দেওয়া গেলেও জ্বালানি তেল ও গ্যাস নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়বে এপ্রিল ও মে মাসে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আগামী দুই মাসের জন্য আগাম পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে তারা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পেরেছে চাহিদার মাত্র এক-চতুর্থাংশ তেল।
চলতি মার্চে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল। তবে গত ২৪ দিনে এসেছে আটটি। যেগুলোতে তেল ছিল মাত্র দুই লাখ টন। মোট ৫১ হাজার টন ডিজেল বোঝাই আরও তিনটি জাহাজ আছে পাইপলাইনে। কিন্তু অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেড় লাখ টন জ্বালানি তেলের বাকি ছয়টি জাহাজ। অভিন্ন চিত্র আছে এলপিজি নিয়েও। চলতি মাসে ৯টি এলপিজি বোঝাই জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে মাত্র পাঁচটি। প্রায় আড়াই লাখ টনের চারটি এলপিজির জাহাজ পড়েছে অনিশ্চয়তায়।
ঘাটতি কমাতে আগামী এপ্রিলের জন্য প্রাথমিক আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। সমুদ্রপথে এপ্রিলে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে তিনটি পার্সেলের মাধ্যমে মোট তিন লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে তারা। তবে এখন পর্যন্ত জাহাজে করে মাত্র এক লাখ ১০ হাজার টন ও পাইপলাইনে ২০ হাজার টন ডিজেল পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। এটি চাহিদার এক-চতুর্থাংশ হলেও মে মাসের জন্য মেলেনি এমন নিশ্চয়তা।
বিপিসি জানায়, চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং বিপিসির বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তারা বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময় মেনে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অপরিশোধিত তেলের চাহিদাও অর্ধেক পূরণ হয়নি। ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাপি’ নামে জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। এ জন্য চলতি মাসে অপরিশোধিত তেলের নতুন কোনো চালান দেশে আর আসছে না।