বিপিসি ও তেল কোম্পানীগুলো ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা এফডিআরে বেশি আগ্রহী

আপদকালীন সময়ে ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ২০২০ সালে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত রাখার সিদ্ধান্ত ৬ বছরেও কার্যক্রম হয়নি। ২০২০ সালে ৬০ দিনের তেলের ধারণ সক্ষমতা তৈরি করার সিদ্ধান্ত হলেও এখন আছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মতো।

ইরান যুদ্ধের সংকটে নতুন করে সক্ষমতা বৃদ্ধির আলোচনা নুতন করে শুরু হয়েছে। যদিও ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনের লক্ষ্যমাত্রার আলাচনা এখন তুলছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

অভিযোগ রয়েছে, বিপিসি এবং তার অধীনস্থ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি এতে বেশে অনাগ্রহের কারনে ৬০ দিনের জ¦ালানি তেলের মজুত রাখার সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখেনি। নতুন করে সংকট দেখা দেওয়ায় জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ানোর বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে।

সূত্র জানায়, জ¦ালানি তেল কোম্পানী গুলো তেলের মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আগ্রহী নয়, তাদের আগ্রহ ব্যাংকে টাকা এফডিআর করে রাখা। যা থেকে বছরান্তে অপরিচালন আয় বাড়িয়ে মুনাফা লুটে নেওয়া। তেল ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব তাদের হাত থাকে না। কিন্তু ব্যাংকের এফডিআর তাদের হাতে থাকে। অপরিচালন আয় যতো বাড়বে প্রফিট বোনাস ততবেশি। তাই ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা জমা রাখতে বেশি আগ্রহী তারা। কিন্তু জ¦ালানি তেলের মজুদ মেয়াদ বাড়াতে তাদের আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। তেল কোম্পানী গুলোর আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন তাইই প্রমান করছে।

যমুনা অয়েল কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১১৩ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৭০ কোটিতে। একইভাবে সহযোগী বিনিয়োগ খাতে ২১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। কোম্পানিটির অপরিচালন খাতের আয় ছিল ২১ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২৪ কোটি টাকা হয়েছে। কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রফিট বোনাস দিয়েছে ৪২ কোটি ৫৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। যা আগের অর্থবছরে ছিল ২১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজারে।

মেঘনা অয়েল কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্বল্প ও মেয়াদী এফডিআর রয়েছে ২৮২৬ কোটি টাকা। এছাড়া অবচয় তহবিলে রয়েছে ১৭৮ কোটি টাকা। কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপরিচালন খাত থেকে আয় করেছে ৬৮৬ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৭৩ কোটি টাকা। কর্মচারীদের প্রফিট বোনাস দেওয়া হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৩৬ কোটি টাকা।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় আমানত এবং প্রফিট বোনাসও বেড়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রফিট বোনাস দিয়েছে ৩৭ কোটি টাকার উপরে। যা আগের বছরে ছিল ২৬ কোটি টাকার মতো।

যখন কোম্পানিগুলোর হুইলিং চার্জ নির্ধারণ করা হয় তখন তাদের তেল-বেচাকেনা আয়-ব্যয় বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অপরিচালন আয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। যে কারণে কোম্পানিগুলো ব্যাংকে আমানত জমাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যাতে তারা বছর শেষে কাড়ি কাড়ি টাকা প্রফিট বোনাস পেতে পারে।

গত অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেয়েছেন ১৮ লাখ টাকা, যমুনা অয়েল ১৩ লাখ ৫০ হাজার এবং পদ্মা অয়েল পেয়েছে ৬ লাখ টাকা বোনাস। তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে বারবার পরাজিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যে কোন সংকট কিংবা কোথাও যুদ্ধ লেগে গেলেই অস্থির হয়ে উঠছে দেশের জ্বালানি খাত। তারপরও থেকে থেকে উপেক্ষিত। আবার যেটুকু মজুত সক্ষমতা রয়েছে সেটিও যথাযথভাবে পরিকল্পনার অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২৪ মার্চ দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার মে. টন। অন্যদিকে পেট্রোল অকটেন ছিল ২৬ হাজার টন। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক জ্বালানি তেলের চাহিদা, পেট্রোল ১৪০০ টন, অকটেন ১২০০ টন, ডিজেল ১২ হাজার টনের মতো। সে হিসেবে ডিজেল পনের দিনের মতো, এবং পেট্রোল অকটেন ১০ দিনের মতো মজুদ রয়েছে।

পেট্রোল পুরোপুরি দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়, আর অকটেন সামান্য পরিমাণে আমদানি করা হয়। অন্যদিকে ডিজেল ৭৫ হাজার টন দেশের পথে রয়েছে। যে কারণে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত মজুত নিয়ে কোন সংশয় নেই বলে মনে করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। তাই জরুরি ভিত্তিতে রেলওয়ের ডিপো, ওয়াগন থেকে শুরু করে যেখানে যে অবকাঠামো রয়েছে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, দেশের সবচেয়ে পুরোনো তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। বিপিসির আমদানি করা তেল এই তিন কোম্পানি শুধু বিতরণ করে। তিন কোম্পানির আওতায় ফিলিং স্টেশন আছে ২ হাজার ৩০৭টি। দেশের তেল মজুতের বেশির ভাগ ট্যাংকারও এই তিন কোম্পানির আওতায়। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ৬০ দিনের মজুতের সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দায়িত্ব ওই তিন বিতরণ কোম্পানির। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করেনি। যার কারণে দেশ বড় বিপাকে পড়েছে।

পেট্রোলপাম্পে ট্যাগ অফিসাররা যেসব কাজ করবেন:

দেশের জ্বলানি খাতে অস্থিরতার মধ্যে সব পেট্রোল পাম্পের তদারকির জন্য ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এবার তাদের কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। রোববার বিদ্যুৎ,জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয় থেকে এক বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়।

যেসব কাজ করবেন ট্যাগ অফিসাররা ফিলিং স্টেশনের দৈনিক প্রারম্ভিক মজুত রেকর্ডভুক্ত করা। ডিপো থেকে সরবরাহ করা জ্বালানি তেল স্ব স্ব ফিলিং স্টেশনে উপস্থিত হয়ে পরিমাপপূর্বক গ্রহণ করা এবং ফিলিং স্টেশনের পে-অর্ডার ও ডিপোর চালান/ রিসিটের সঙ্গে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা।

স্ব স্ব ফিলিং স্টেশনে উববঢ়-জড়ফ/ উববঢ়-ঝঃরপশ এর মাধ্যমে সরবরাহ করা জ্বালানি তেল বুঝে নেওয়া। ফিলিং স্টেশনে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রারে ডিপো থেকে দৈনিক জ্বালানি তেল গ্রহণের হিসাব লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না তা মনিটর করা।

ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের দৈনিক মিটার রিডিং সংক্রান্ত রেজিস্ট্রার পর্যবেক্ষণ করে দৈনিক বিক্রয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

দৈনিক বিক্রয় শেষে ফিলিং স্টেশনের সমাপনী মজুত পর্যালোচনা। ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের পরিমাপ যথাযথ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত তদারকি করা। ফিলিং স্টেশন অনুমোদন প্রাপ্তির সময় বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানে পণ্যভিত্তিক মজুত ক্ষমতার তথ্য এবং বিদ্যমান মজুত ক্ষমতার তথ্য যাচাই করা। ফিলিং স্টেশনের আশপাশে অননুমোদিত কোনো ট্যাংক/স্থাপনা আছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।

ডিপো-থেকে-পাম্প, পাম্প থেকে-ভোক্তা সরবরাহ ব্যবস্থাকে দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিটি ডিপো, ট্যাঙ্কার, পাম্প এবং খুচরা বিক্রির তথ্য একত্রে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রতিটি পাম্পে দিনে অন্তত ৩ বার (সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা) স্টক আপডেট বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ডিপো থেকে জ্বালানি নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু না করলে তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি গ্রহণের ১ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শুরু বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রথমবার সতর্কতা, দ্বিতীয়বার মোবাইল কোর্ট, তৃতীয়বার সাময়িক স্থগিতাদেশ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাম্প খোলা আছে কি না, স্টক রেজিস্টার সঠিক আছে কি না, ডিসপ্লে বোর্ড আছে কি না, ক্যাশ মেমো দেওয়া হচ্ছে কি না, নির্ধারিত সীমা মানা হচ্ছে কি না, কন্টেইনারে অবৈধ বিক্রি হচ্ছে কি না, সারি ব্যবস্থাপনা কেমন এসব বিষয় জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ রিপোর্ট করা।

জ্বালানি তেল আমদানি-সরবরাহে রাষ্ট্রীয় একক নিয়ন্ত্রণ বাতিল চেয়ে নোটিশ :

জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির একক নিয়ন্ত্রণ বাতিল চেয়ে এ বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে জ্বালানি তেল মজুতদারি ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রো বাংলার আমদানির বিপরীতে বকেয়া ৩৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জনস্বার্থে রোববার মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার এ নোটিশ পাঠান। ই-মেইল ও ডাকযোগে এ নোটিশ পাঠানো হয়।

নোটিশে বলা হয়েছে, বন্ধ থাকা অনেক পাম্পে অভিযানে হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেলের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আইনের বিধান থাকা সত্ত্বেও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মজুতদারি ও কালোবাজারি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নামে মাত্র জরিমানা করায় অবৈধ মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাতে ‘ব্যক্তি পর্যায়েও মজুতদারি শুরু হয়েছে’ বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাম্প বন্ধ তারপরও অপেক্ষা :

তেল নেওয়ার জন্য সকাল সাড়ে নয়টায় পাম্প থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লাইনে (সারি) দাঁড়ান চালক আবদুর রাজ্জাক। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে এগোনোর পর তিনি জানতে পারেন, যে পাম্পের সারিতে অপেক্ষা করছেন, সেটি বন্ধ।

সারির অনেক পেছনে থাকায় পাম্প বন্ধ থাকার তথ্য এতক্ষণ জানতে পারেননি রাজ্জাক। কিন্তু যখন জানতে পারেন, তখন সারিতে বেশ খানিকটা পথ এগিয়েছেন। তাই আর সারি ছেড়ে না গিয়ে আরও অপেক্ষা করছেন তিনি। রোববার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে কথা হয় রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনি প্রাইভেট কারের সারিতে অপেক্ষা করছিলেন।

রাজ্জাক বলেন,অনেকটা পথ এগিয়েছি। এখন আর অন্য কোনো পাম্পে যাচ্ছি না। তেলে নিতেই হবে। গাড়ির তেল শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে শঙ্কায় আছি, স্যারের অফিস শেষ হওয়ার আগে তেল নিতে পারব কি না। যদি না পারি, স্যারকে সিএনজিতে করে ফিরতে বলতে হবে।’

পাম্প বন্ধ থাকায় তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সেখানে ছিলেন না। আল আমিন মিয়া নামের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে তেল শেষ হয়ে গেছে। গাড়ি তেল নিতে ডিপোয় গেছে। গাড়ি কখন আসবে, তা জানেন না তিনি। এই তথ্য চালকদের দিয়েছেন তাঁরা। তারপরও চালকেরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

আসাদগেট এলাকার আরেকটি পাম্প সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন। সকাল থেকে এই পাম্পে তেল সরবরাহ ঠিক আছে। এখানে প্রাইভেট কারের সারি পাম্প থেকে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত দেখা গেছে। আর মোটরসাইকেলের সারি বিস্তৃত হয়েছে আধা কিলোমিটার। দীর্ঘ এই সারি ঠিক রাখতে গলির মুখে পাম্পের কয়েকজন কর্মী প্রাইভেট কারে রঙিন কাগজের স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছিলেন।

তেমনই একজন কর্মী মো. মামুন। ইকবাল রোডের মুখে গাড়িতে স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সিরিয়াল ছাড়া লাইনে অন্য গাড়ি ঢুকে গেলে তা নিয়ে চালকদের মধ্যে ঝামেলা হয়। এ জন্য পাম্প কর্তৃপক্ষ লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি গাড়িতে হলুদ রঙের স্টিকারের ব্যবস্থা করেছে। যাঁরা সিরিয়াল ছাড়া লাইনে ঢুকবেন, তাঁদের স্টিকার দেওয়া হবে না। আর এই স্টিকার ছাড়া কাউকে তেল দেওয়া হবে না।’

১০ ঘণ্টা পর উত্তরের ৮ জেলায় তেল সরবরাহ শুরু : পার্বতীপুরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আটক শ্রমিকদের মুক্তির আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা পর রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ এই ঘোষণা দেন। এর ফলে উত্তরবঙ্গের ৮ জেলায় পুনরায় জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

রংপুর বিভাগীয় ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আতাউর রহমান জানান, জেল-হাজতে পাঠানো তিন শ্রমিককে মুক্তি দেয়া এবং নীলফামারীর এনডিসি নিয়াজ ভুইয়াকে অপসারণের আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। এর ভিত্তিতে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকেই ট্যাংকলরির স্লিপ দেয়া শুরু হয়েছে।

এর আগে রোববার সকাল থেকে তেল পরিবহনের কাজে নিয়োজিত ট্যাংকলরি চালকসহ তিন শ্রমিককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানার প্রতিবাদে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করে ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়ন। এতে পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো থেকে উত্তরের ৮টি জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর : গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানার অভিযানে বিপুল পরিমাণ চোরাই ডিজেল জব্দ এবং এক অবৈধ মজুতদারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে মোট ৮৮০ লিটার ডিজেল, যা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অবৈধভাবে মজুত রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জিএমপি সদর থানার আভিযানিক টিম উত্তর সালনা পোড়াবাড়ী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা চোরাই ডিজেল ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত আব্দুর রাজ্জাক ও মোঃ ফিরোজের দোকানে তল্লাশি চালানো হয়।

অভিযানকালে পাঁচটি স্টিলের ড্রামে সংরক্ষিত মোট ৮৮০ লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় আব্দুর রাজ্জাক (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি উত্তর সালনা এলাকার বাসিন্দা।

গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আমিনুল ইসলাম জানান, কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরি করে অবৈধভাবে মজুত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গ্রেফতারকৃত আসামি এবং পলাতক অপর জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

মোংলা সংবাদদাতা : বাগেরহাটের মোংলায় একটি জ্বালানি তেল ডিপোতে অবৈধ মজুতের অভিযোগে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর নেতৃত্বে একটি যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্যাংকগুলোতে সংরক্ষিত জ্বালানি তেলের পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ এবং নথিপত্র যাচাই করে উল্লেখযোগ্য গরমিল শনাক্ত করা হয়।

অভিযানের ফলে যমুনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের তিনটি ট্যাংকে মোট ১২ হাজার ৬১৩ লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি তেল মজুত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই তেলের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৮৫০ টাকা। ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. আল আমিন খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে এই অভিযান চালানো হয়। এতে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ ও এনএসআই একযোগে অংশ নেয়। অভিযান পরিচালনার সময় মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন এলাকায় অবস্থিত ডিপোটির তিনটি ট্যাংকের জ্বালানি তেলের পরিমাণ মেজারিং টেপের মাধ্যমে সরাসরি নিরূপণ করা হয় এবং তা রেকর্ডভুক্ত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

এই তিনটি ট্যাংকের হিসাব মিলিয়ে মোট ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেলের গরমিল পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত বড় পরিমাণের পার্থক্য সাধারণ পরিমাপজনিত ত্রুটির মধ্যে পড়ে না, ফলে বিষয়টি সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং বিস্তারিত তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা জানান, তেলের পরিমাণ ইচ্ছাকৃতভাবে কম বা বেশি দেখিয়ে পরবর্তী সময়ে আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, এমন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন খানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোংলা ডিপো থেকে সাময়িকভাবে তেল সরবরাহ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে সম্মত হননি।

এদিকে, বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) অনুপ দাস জানিয়েছেন, পুরো ঘটনার একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব এখন বিপিসি কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত রয়েছে।

অবৈধভাবে মজুত জ্বালানি তেলের বিষয়ে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।