রাজশাহীতে শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেন চলছে বেহাল দশা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র তথা আইসিইউ-তে বেড সংকটের কারণে অনেক শিশুকেই জরুরি চিকিৎসা দেয়া যায়নি। ফলে গত আড়াই মাসে অন্তত ৫৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এসময়ে আবার হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর চিকিৎসা নিয়েও হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে দুবছর ধরে পড়ে আছে নতুন করে নির্মিত একটি হাসপাতাল ভবন। কিন্তু সেটি চালু হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অভাবে। তবে শিশু চিকিৎসার এই সংকটের জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করে দায় মেটানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রামেক হাসপাতালের প্রশাসন বলছে, রাজশাহী মেডিকেলে বর্তমানে ৪০ শয্যার যে আইসিইউ চলছে, সেটা সরকার অনুমোদিত নয়। সম্পূর্ণ হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলে এটি। এখানে সরকার একজনকেও নিয়োগ দেয়নি। অপরদিকে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে রামেক হাসপাতালের প্রশাসনকে দায়ী করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাপ্তবয়স্কদের ৪০টি শয্যার মধ্যে যুবকদের ১২টি, বয়স্কদের জন্য ১৬ ও ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য ব্যবহার করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সরবরাহ না করায় শিশুদের ২০টি শয্যা চালু করা যাচ্ছে না। কিন্তু শিশুদের আইসিইউ’র চাহিদা অনেক বেশি। এতে ভর্তি করার জন্য অপেক্ষায় থেকে গত আড়াই মাসে ৫৩টি শিশু মারা গেছে। মূলত আইসিইউ বেডের সংকটে এসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড থেকে হামে আক্রান্ত চারটি শিশুকে গত বৃহস্পতিবার আইসিইউতে নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, তাদের তিনজনই মারা গেছে। বেঁচে থাকা এক শিশুকে শনিবার বিকেলে আইসিইউতে নেয়া গেছে। আরো তিন শিশুকে আইসিইউতে নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এদিকে এই সময়ে রাজশাহী অঞ্চলে হামের প্রকোপও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসে রাজশাহী মেডিকেলে হামের চিকিৎসা চলা অবস্থায় মোট ১২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেয়ার পরেও ৯ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
হামের চিকিৎসা নিয়েও সংকট
চিকিৎসা ব্যবস্থা, আইসোলেশন সংকট এবং টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল সূত্রে জানায়, চলতি মাসেই হামে আক্রান্ত অন্তত ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেয়ার পরও ৯ শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এছাড়া আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় আরও কয়েক শিশুর মৃত্যু হয়। গতকাল রোববার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’-এর লক্ষণ নিয়ে শিশু রোগী ভর্তি রয়েছে। আবার এসব রোগীদের পাশেই অন্য অসুস্থ শিশুদের রাখা হচ্ছে। ফলে অন্য শিশুদেরও হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের অফিসের তথ্যমতে, ১৮ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৫৩টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যা মোট পরীক্ষার প্রায় ২৯ শতাংশ। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে অন্তত ৮৪ শিশুকে আইসিইউতে নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আইসিইউ সুবিধা পাওয়ার পরও ৯ জন এবং অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস গণমাধ্যমকে জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও জনবল সংকটের কারণে রোগী স্থানান্তর সম্ভব হচ্ছে না। আপাতত হাসপাতালের ১০ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে এমন কোনো কর্নার দেখা যায়নি। তবে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু কর্নারের সাইনবোর্ডের পাশে ইংরেজিতে ‘হাম কর্নার’ লেখা দুটি কাগজ সাঁটানো রয়েছে। ভেতরে দুই পাশে পাঁচটি করে ১০টি শয্যা রয়েছে। ওই কর্নারের রোগীদের কী হয়েছে জানতে চাইলে কয়েকজন স্বজন বলেন, তাঁদের বাচ্চার ডায়রিয়া হয়েছে। এদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে অন্য রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর সংক্রমণের ঘটনা বাড়ছে বলে তারা দাবি করেন। এক শিশু চিকিৎসক জানান, এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি। অনেক শিশুর টিকা কার্ডে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হামের টিকার তথ্য নেই। এছাড়া ৯ মাস বয়সের আগেই শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। একই সাথে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ বলছেন, দ্রুত আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি, কার্যকর আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু এবং গণটিকাদান কার্যক্রম জোরদার না করলে হামের এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে। এজন্য এবিষয়ে এই মুহুর্তেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চালু হচ্ছে না শিশু হাসপাতাল
রাজশাহী নগরীর টিবিপুকুর এলাকায় পড়ে আছে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট নবনির্মিত শিশু হাসপাতালের ভবন। দুই বছর আগে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়নি। এ অবস্থায় অযতœ-অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে। এরই মধ্যে গত বছর আগস্টের পর ভবনটি দখল করারও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে। তবে ঠিকাদারদের লোকজনের বাধার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এ হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয় গত ২০২৩ সালে। কিন্তু ব্যবহার না হওয়া ভবনের রংও উঠতে শুরু করেছে। লাগানো এসিগুলো দুই বছর ধরে ব্যবহৃত না হওয়ায় নষ্ট হতে বসে। এটি চালু করতে মন্ত্রণালয়ের সাড়া মিলছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এটি চালু করা গেলে রাজশাহীসহ বৃহত্তর অঞ্চলের শিশু চিকিৎসার সংকট অনেকটা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।