ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। খাবারের সংকট, ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ত্রাণের অপেক্ষায় দিন কাটছে লাখ লাখ মানুষের।

গত সপ্তাহে মালাক্কা প্রণালীতে সৃষ্ট বিরল ঘূর্ণিঝড় আচেহ, উত্তর সুমাত্রা ও পশ্চিম সুমাত্রায় আঘাত হানে। এতে অন্তত ১৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মৃতের সংখ্যা ৫০০–রও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাদা আর ভাঙা রাস্তাঘাটের কারণে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা স্পষ্ট।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশ—থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা—এই প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ, উত্তর সুমাত্রা ও পশ্চিম সুমাত্রা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক এলাকায় এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং জরুরি সরবরাহ পৌঁছায়নি।

আচেহর বাসিন্দা আমালিয়া বলেন, “বন্যার পানি যেন সুনামির মতো এসেছিল। আমার দাদি বলছেন, এটি তার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা।”

রাস্তায় কাদা ও ধ্বংসস্তূপ জমে থাকায় ত্রাণকর্মীরা পায়ে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে করে দুর্গতদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

পশ্চিম সুমাত্রায় টুইন ব্রিজ এলাকায় রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ দেখছিলেন মারিয়ানা নামে এক নারী। তিনি তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে ও নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাওয়ার আশায় আছেন। তিনি বলেন, “খননযন্ত্র যখন মাটি তুলছে, ভাবছি—আমার ছেলেকে কী অবস্থায় পাবে? অক্ষত থাকবে তো? আমার মা, আমার দেবর… হয়তো তাদের চেনাই যাবে না।”

অনেক এলাকায় মানুষ ত্রাণের অপেক্ষায় দিন পার করছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা দু–তিনদিন ধরে কিছু খেতে পারেননি। উত্তর সুমাত্রার মধ্য তাপানুলি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর একটি। সেখানকার বাসিন্দা মায়াসানতি বলেন, “সব শেষ হয়ে গেছে। খাবার প্রায় নেই। ইনস্ট্যান্ট নুডুলস নিয়েও মারামারি হচ্ছে। খাদ্য ও চাল জরুরি প্রয়োজন। আমাদের দিকে আসার সব পথ বিচ্ছিন্ন।”

তিনি আরও জানান, বিশুদ্ধ পানি আর ইন্টারনেটের মতো মৌলিক সেবার জন্য তাকে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছে।

মধ্য আচেহ এলাকায় যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের জন্য স্টারলিংক ডিভাইস বসানো হয়েছে। সেখানে লম্বা লাইন দেখা গেছে—মানুষ তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা ফোন চার্জ দিতে অপেক্ষা করছেন। “পাঁচ দিন ধরে কোনো সিগন্যাল নেই। মাকে ফোন দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এখনও পারিনি,” বলেন স্থানীয় বাসিন্দা মার।

উদ্ধার তৎপরতা জোরালো হলেও সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি দুর্বল ছিল এবং ত্রাণ বিতরণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ধীরগতি তৈরি করেছে।

সোমবার প্রেসিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর সুমাত্রা পরিদর্শন করে স্বীকার করেন—বহু রাস্তা এখনো বিচ্ছিন্ন। তবে তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে। প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমরা দৃঢ়তা ও ঐক্য নিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করছি। জাতি হিসেবে আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠব।”

দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গত সপ্তাহের বন্যা ও ভূমিধ্বসে মোট প্রায় ১,১০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে—এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ৩৫৫ এবং থাইল্যান্ডে ১৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের বিপর্যয়ের পেছনে একক কোনো আবহাওয়াজনিত কারণ নয়; বরং নানা জলবায়ুগত উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবেই পরিস্থিতি এতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।