মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'স্বৈরাচারী শাসন নীতি', কঠোর অভিবাসন নীতি এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রতিবাদে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

গত শনিবার দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 'নো কিংস' নামক একটি তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনের ডাকে এই বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এক ডজনেরও বেশি দেশেও এ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

বিক্ষোভের আগে জোটের শরিক সংগঠন ইনডিভিজিবল -এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এজরা লেভিন বলেন, ২৮ মার্চ আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

শনিবারের এই কর্মসূচি ছিল 'নো কিংস'-এর তৃতীয় আয়োজন। গত বছরের জুনে হয় প্রথম 'নো কিংস'- বিক্ষোভ এবং অক্টোবরে হয় দ্বিতীয় 'নো কিংস'-বিক্ষোভ।আয়োজকদের তথ্যমতে, দ্বিতীয় 'নো কিংস'-বিক্ষোভে দেশটির ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল।

আয়োজকদের মতে, মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পলে আয়োজিত বিক্ষোভে রাজ্য ক্যাপিটল ভবনের আশপাশের সড়কে প্রায় দুই লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।

এসময় ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স রাজনীতিতে অতিধনীদের প্রভাব নিয়ে বক্তব্য দেন। সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন মিনেসোটায় আইস-এর হাতে হত্যা নিয়ে তার গান 'স্ট্রিটস অব মিনিয়াপোলিস' পরিবেশন করেন। এসময় জনতা 'আইস আউট নাউ' স্লোগান দেয়।

মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ স্প্রিংস্টিনকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলেন, আমেরিকার কোনো 'রাজা' দরকার নেই, তবে 'দ্য বস'-(স্প্রিংস্টিনের ডাকনাম) এর প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং অভিবাসীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানান।

মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেট্টির মৃত্যুর ঘটনা বিক্ষোভে তুলে ধরা হয়। তাদের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। অভিনেত্রী জেন ফন্ডা রেনে গুডের স্ত্রী ব্রেন্ডার একটি বিবৃতিও পড়ে শোনান।

নিউইয়র্ক সিটিতে টাইমস স্কয়ারসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক 'নো কিংস' মিছিল একত্র হয়ে বড় সমাবেশে রূপ নেয়। সেন্ট্রাল পার্ক থেকে মূল মিছিল শুরুর কয়েক মিনিট আগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তি মিছিলের সামনে এসে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস, সিটির পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানে উইলিয়ামস, অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো, ধর্মীয় নেতা আল শার্পটন এবং পদ্মা লক্ষ্মী।

নিউইয়র্কে বিক্ষোভরত অনেক মানুষের হাতে এলজিবিটিকিউ+ প্রাইড ও ফিলিস্তিনি পতাকা দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে, তা হলো যুদ্ধবিরোধী অবস্থান।

কুইন্সের ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা এমবি (নিরাপত্তার কারণে পূর্ণ নাম প্রকাশ করতে চাননি) বলেন, এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমেরিকার মানুষ প্রশাসনের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরোধী। তারা যুদ্ধ চায় না, তারা চায় স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়ন।

ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় এক ডজন ফিলিস্তিনি মা লিংকন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ১০ ফুট উঁচু ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান।

৪২ বছর বয়সী হাজামি বারমাদা বলেন, অধিকাংশ আমেরিকান জানেন না তাদের করের টাকা যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ অনেক আমেরিকান মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। ইসরায়েলের যুদ্ধ চালাতে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।

স্থানীয় সংগঠন ফ্রি ডিসিসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতৃত্বে আরও অনেক বিক্ষোভকারী দক্ষিণ-পূর্ব ওয়াশিংটনের ফ্রেডেরিক ডগলাস ব্রিজে জড়ো হন। সেখান থেকে তারা মিছিল করে দক্ষিণ-পশ্চিম ডিসির ফোর্ট ম্যাকনেয়ার পর্যন্ত যান, যেখানে হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার বসবাস করেন।

শিকাগোর গ্রান্ট পার্কে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী ট্রাম্পবিরোধী স্লোগান দেন। হাজারো মানুষের সামনে শহরের মেয়র ব্র্যান্ডন জনসন জানান, তাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়েছে।

শিকাগোর সমাবেশে অন্যান্য বক্তারা শ্রমিক অধিকার এবং অভিবাসী ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেন।

ইনডিভিজিবল-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিয়া গ্রিনবার্গ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, 'নো কিংস' বিক্ষোভ সমাবেশে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধনকারীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ বড় শহরগুলোর বাইরে থেকে এসেছেন। এর মধ্যে রিপাবলিকান পার্টি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সুইং কাউন্টিগুলোও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান-সমর্থিত শহরগুলোতেও ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার পেনসিলভানিয়ার লেবানন, টেক্সাসের মিডল্যান্ড এবং আইডাহোর বোইসিতে শত শত মানুষ প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সময়ে টোকিও, প্যারিস, বার্লিন, রোম ও সিডনিসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজকদের মতে, আইস-এর অভিযান থেকে শুরু করে ভোটাধিকার হুমকিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভকারীরা একত্র হয়েছে।

'ভয়েসেস অব ফ্লোরিডা'-এর নির্বাহী পরিচালক সারাহ পার্কার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং একই সঙ্গে ইরানে একটি অবৈধ যুদ্ধ চলছে। এতে আমেরিকার মানুষ ক্ষুব্ধ।

সিএনএন জানায়, ওয়েস্ট পাম বিচসহ কয়েকটি স্থানে পাল্টা বিক্ষোভকারীরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ৫০ জন ট্রাম্প-সমর্থক মেগাফোন ও 'প্রাউড বয়েজ' লেখা টুপি পরে 'নো কিংস' বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তর্কে জড়ান।

'নো কিংস' জোট 'অসহিংস' বিক্ষোভের পক্ষে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের কোনো অস্ত্র বহন করতে দেওয়া হয়নি। জুনে সল্ট লেক সিটিতে প্রথম 'নো কিংস ডে'-তে এক বিক্ষোভকারী নিহত এবং আরেকজন আহত হন।

বিক্ষোভের আগে পার্কার বলেন, বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের অহিংস বিক্ষোভের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

'নো কিংস' ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীরা কোনো ধরনের অস্ত্র, এমনকি বৈধ অস্ত্রও সঙ্গে আনতে পারবেন না।

এর আগে, জুনে অনুষ্ঠিত প্রথম 'নো কিংস ডে'-তে সল্ট লেক সিটিতে এক বিক্ষোভকারী নিহত এবং আরেকজন আহত হন।

হোয়াইট হাউস এবং রিপাবলিকান নেতারা শনিবারের 'নো কিংস ডে' কর্মসূচিকে 'ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট থেরাপি সেশন' বলে নিন্দা জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, এসব বিক্ষোভ বামপন্থী অর্থায়নে সংগঠিত।

ট্রাম্প প্রশাসন আইসবিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ফেডারেল মামলা করেছে। টেক্সাসে একটি বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে 'অ্যান্টিফা' সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে গুড ও প্রেট্টি ফেডারেল এজেন্টদের হাতে নিহত হন।

আইস- এজেন্ট মোতায়েনের আশঙ্কা নিয়ে আয়োজকদের উদ্বেগ রয়েছে। গত জুনে 'নো কিংস' বিক্ষোভ লাইভস্ট্রিম করার সময় সাংবাদিক মারিও গেভারাকে আটক করা হয়।

ডিয়ারড্রে শিফেলিং বলেন, আইস মোতায়েনের হুমকি মূলত আমাদের ভয় দেখানোর কৌশল।

আয়োজকরা বারবার বলেছেন, 'নো কিংস ডে' বৃহত্তর আন্দোলনের একটি অংশ এবং এই আন্দোলন চলবে।

গ্রিনবার্গ বলেন, এটি শুধু একদিনের প্রতিবাদ নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের পক্ষের সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করার একটি উদ্যোগ।