যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর ঠিক আগমুহূর্তে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে। সেই স্থানেই উপস্থিত ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সিআইএ কয়েক মাস ধরেই খামেনির ওপর নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছিল। তাঁর অবস্থান, চলাচলের ধরন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে সংস্থাটির কাছে বিস্তারিত তথ্য ছিল। সর্বশেষ গোয়েন্দা তথ্য থেকে জানা যায়, শনিবার সকালে রাজধানী তেহরান-এর প্রাণকেন্দ্রে একটি সরকারি কম্পাউন্ডে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, যেখানে খামেনির উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়।

এই তথ্য পাওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলার সময়সূচি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গোয়েন্দা তথ্যকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখে। কারণ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল শীর্ষ ইরানি নেতৃত্বকে আঘাত করা এবং খামেনিকে নির্মূল করা।

গত বছরের জুনে ১২ দিনব্যাপী সংঘাতের পর থেকেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে। শনিবারের হামলা একদিকে তাদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য পূরণ করেছে, অন্যদিকে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বারবার হুমকির মুখে পড়েও ইরানি নেতৃত্ব যথেষ্ট শক্ত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

গোয়েন্দা কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, সিআইএ ইসরায়েলকে খামেনির অবস্থান নিয়ে ‘হাই ফিডেলিটি’, অর্থাৎ অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করেছিল। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এসব সূত্র নিজেদের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে।

এই তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েল মার্কিন ও নিজস্ব গোয়েন্দা সহায়তায় শনিবার ‘রোরিং লায়ন’ নামে একটি অভিযান পরিচালনা করে। কয়েক মাস ধরেই এর পরিকল্পনা চলছিল। শুরুতে রাতের অন্ধকারে হামলার পরিকল্পনা থাকলেও, শনিবার সকালে সরকারি কম্পাউন্ডে বৈঠকের খবর পাওয়ার পর সময় পরিবর্তন করা হয়। ওই কম্পাউন্ডে ইরানের প্রেসিডেন্সি অফিস, সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কার্যালয় অবস্থিত।

ইসরায়েল নিশ্চিত হয়েছিল, এই সমাবেশে ইরানের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা থাকবেন। তাদের মধ্যে ছিলেন- আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, সামরিক পরিষদের প্রধান অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সৈয়দ মজিদ মুসাভি, গোয়েন্দা উপমন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজিসহ আরও অনেকে।

ইসরায়েলের স্থানীয় সময় অনুযায়ী শনিবার সকাল ৬টার দিকে অভিযান শুরু হয়। ওই সময় যুদ্ধবিমানগুলো ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। হামলায় তুলনামূলক কম বিমান ব্যবহার হয়। কিন্তু যেগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো ছিল দূরপাল্লার ও অত্যন্ত নির্ভুল অস্ত্রে সজ্জিত।

যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর, তেহরানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। হামলার সময় জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কম্পাউন্ডের একটি ভবনে ছিলেন এবং খামেনি পার্শ্ববর্তী অন্য একটি ভবনে ছিলেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার লেখা একটি বার্তা দেখার সুযোগ পেয়েছে। সেখানে লেখা, ‘আজ (শনিবার) সকালের হামলাটি তেহরানের বেশ কয়েকটি স্থানে একই সঙ্গে চালানো হয়েছে। এর একটিতে ইরানের রাজনীতি ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ ব্যক্তিরা একত্রিত হয়েছিলেন।’ বার্তায় ওই কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের জন্য ইরানের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল এই হামলায় কৌশলগত চমক দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

অভিযানটির বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউস এবং সিআইএয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল টাইমস। তবে তাদের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ দুজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। ইসরায়েল যে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল, সেখানেও এই দুজনের নাম ছিল- রিয়ার অ্যাডমিরাল শামখানি এবং মেজর জেনারেল পাকপুর।

গত জুনে ইরানের পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র জানে খামেনি কোথায় লুকিয়ে আছেন। চাইলে তাকে হত্যা করা সম্ভব।’ একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শনিবারের অভিযানেও সেই একই নেটওয়ার্কের (তথ্য প্রাপ্তির) ওপর নির্ভর করা হয়।

সরকারি কম্পাউন্ডে হামলার পর ইরানের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অবস্থানগুলোও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। এতে ইরানের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, ঊর্ধ্বতনদের বড় একটি অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস