দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান তীব্রতর করে ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বোফোর্ট দুর্গ’ (Beaufort Castle) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গত ৩১ মে (২০২৬) মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া একটি নামমাত্র যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইসরায়েলি স্থলবাহিনী এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বিগত ২৬ বছরের মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় এবং গভীরতম অনুপ্রবেশ।
বেলফোর্ট দুর্গ (বোফোর্ট দুর্গ বা কালআত আল-শাকিফ নামেও পরিচিত) হলো দক্ষিণ লেবাননে লিটানি নদীর তীরে অবস্থিত প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত দুর্গ। এটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় পুরো দক্ষিণ লেবানন এবং ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের উপর নজরদারি করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গটির মূল বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস:
নির্মাণ: দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডারদের দ্বারা এই দুর্গটি নির্মিত হয়। ফরাসি ভাষায় এর নাম 'বোফোর্ট'-এর অর্থ "সুন্দর দুর্গ"।কৌশলগত গুরুত্ব: এটি এমন এক দুর্গম শৈলশিরায় অবস্থিত যে একে প্রাকৃতিকভাবেই দুর্ভেদ্য বলে মনে করা হয়।আধুনিক সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত ও যুদ্ধের সময় এটি বারবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ১৯৮২ সালের ইসরায়েলের লেবানন আগ্রাসনের পর এটি বড় ধরনের সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল
৯০০ বছরের পুরোনো এই ক্রুসেডার দুর্গটি দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের বিশাল অঞ্চলের ওপর নজরদারির জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে একটি ‘নাটকীয় মোড়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলের ঘোষিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ সুরক্ষার অংশ হিসেবে তাদের সৈন্যরা এই দুর্গে অবস্থান অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে, লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইসরায়েলের এই আগ্রাসনকে ‘পোড়ামাটি নীতি’ (scorched-earth policy) এবং একতরফা যৌথ শাস্তি হিসেবে নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে কার্যকর যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছেন।
ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে বোফোর্ট দুর্গটির সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই দুর্গটিকে লেবাননের সামরিক পরিভাষায় ‘দক্ষিণের চোখ’ বলা হয়। ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত লেবাননে বিগত দখলদারিত্বের সময়ও ইসরায়েল এটিকে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তবে বর্তমান ড্রোন প্রযুক্তির যুগে এই দুর্গের সামরিক উপযোগিতা নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরেই সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে প্রকৃত কৌশলগত বিজয়ের চেয়ে ইসরায়েলি জনগণের মনস্তত্ত্ব জয়ের ‘প্রতীকী বিজয়’ হিসেবে দেখছেন। এদিকে এই অভিযানের পর লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩,৩৭০ ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।