ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে উপসাগরীয় দেশগুলো ও তুরস্কের সক্রিয় কূটনীতি। বিস্ময়করভাবে, এই প্রক্রিয়ায় ইসরাইলও ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো গণহত্যা হবে না এবং হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে। এসব বক্তব্যের পর মনে হচ্ছে, অন্তত এই মুহূর্তে ইরানকে ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে না, কিংবা তার চেয়েও ভয়াবহ কোনো দৃশ্য তৈরি হয়নি।
তবে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড বা সরাসরি বোমা হামলা আপাতত না ঘটলেও, ইরানি শাসনের পক্ষে এটিকে চূড়ান্ত স্বস্তি হিসেবে দেখা নিরাপদ নয়। সর্বোচ্চ বলা যায়—সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত আছে।
এই হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও হতে পারে। এর লক্ষ্য হতে পারে ইরানের নেতৃত্বকে আশ্বস্ত করা, যাতে তারা সতর্কতা কমায় এবং পরবর্তী সময়ে আঘাত হানা সহজ হয়। আবার এটাও সম্ভব যে, ট্রাম্প সত্যিই অন্তত কিছু সময়ের জন্য এই বিকল্প থেকে সরে এসেছেন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আছে—আঞ্চলিক মিত্রদের দৃঢ় বিরোধিতা, ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি, ইরানে বড় সামরিক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রস্তুতির ঘাটতি, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, ‘মিশন ক্রিপ’-এর ঝুঁকি (অর্থাৎ সীমিত অভিযানের ধীরে ধীরে পূর্ণ যুদ্ধে রূপ নেওয়া), ইরানের ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং গ্রহণযোগ্য কোনো বিরোধী নেতৃত্বের অভাব। এই শেষ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভিকে না সম্মান করেন, না বিশ্বাস করেন। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে তিনি যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে দাবি করেন, সেটিও ট্রাম্পের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
ইরানে হামলা না করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বড় কারণ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তেলের দাম বাড়বে, যা চলতি বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ভোটারদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া, এই ইস্যুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলেও তীব্র বিভাজন রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের অধিকাংশ আইনপ্রণেতাই ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন।
ট্রাম্প সম্ভবত ইরানের জন্য একটি ‘ভেনেজুয়েলা-স্টাইল সমাধান’ই বেশি পছন্দ করেন—অর্থাৎ শক্তি প্রদর্শন ও হুমকি, এরপর দ্রুত উত্তেজনা প্রশমন। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো বোমা হামলার ক্ষেত্রেও তিনি একই কৌশল অনুসরণ করেছিলেন।
হুমকি ও সংলাপের মধ্যে দোলাচলের এই কৌশল ট্রাম্প শুধু ইরান নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও ব্যবহার করেছেন। এই কৌশলের ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা থাকেÑ শত্রু সরকার টিকে থাকতে পারবে, যদি তারা সহযোগিতা করে বা অন্তত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।
ট্রাম্প মূলত একজন ব্যবসায়ী। তার দৃষ্টিতে, গভীরভাবে বিরোধী হলেও স্থিতিশীল ও সংগঠিত কোনো স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করা, অনিশ্চিত পরিণতির একটি বিশৃঙ্খল যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।
উপসাগরীয় দেশগুলোর হিসাব-নিকাশও একই রকম বাস্তববাদী। তারা এমন একটি পরিস্থিতি চায়, যেখানে ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল থাকবে, কিন্তু পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না। কারণ, একটি কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে উঠলে তা তাদের নিজেদের জনগণের জন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে কথার লড়াই তীব্র হলেও, তেল আবিবের মূল লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যাতে ইসরাইল আর অস্তিত্বগত হুমকির মুখে না পড়ে। তবে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলার পরও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এদিকে, ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ আপাতত কার্যত অকার্যকর। আরেকটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গোপন নাশকতামূলক তৎপরতার মাধ্যমে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের চেষ্টা। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই এমন তৎপরতার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সরকারবিরোধী শক্তিগুলোকে সহায়তা দিয়ে অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানের পথও অনুসন্ধান করা হতে পারে।
এই পুরো পরিস্থিতি ট্রাম্পের ২০২৫ সালের নভেম্বর ঘোষিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের আলোকে দেখতে হবে। প্রায় ৩০ পৃষ্ঠার এই নথি চরম ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শনের প্রতিফলনÑ বিজয়োল্লাসপূর্ণ, আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ভাষায় ভরা।
নথিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বিশ্বের সব অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখতে হবে, যেখানে তার স্বার্থ রয়েছে—আর সেই স্বার্থ ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়েই। একই সঙ্গে, এতে বলা হয় যে, প্রতিটি দেশ বা ইস্যুই মার্কিন কৌশলের কেন্দ্র হতে পারে না।
এই কৌশলপত্র বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলার কথা বললেও, এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলা যাবে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরেই জাতীয় স্বার্থের নামে হস্তক্ষেপকে তার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।
ট্রাম্প একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য চান—যেখানে তিনি ব্যবসা করতে পারবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবেন। অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রপন্থী না হলেও চলবে, তবে তা অবশ্যই মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারবে না।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা জনগণের ইচ্ছার এখানে কোনো গুরুত্ব নেই। এই বিশ্বব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণ কার্যত অনুপস্থিত। সব কিছুর ওপর ঝুলে থাকে একটি হুমকি—ড্যামোক্লিসের তলোয়ার।
সংক্ষেপে, ট্রাম্পের এই ‘ডনরো মতবাদ’-এর মূল কথা একটাইÑ নির্দেশ মানো, নইলে শাস্তি ভোগ করো। ভেনেজুয়েলা ও ইরান এই নীতির সাম্প্রতিক উদাহরণ।