# যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে ইসলামাবাদে বসতে রাজি ইরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিকল্পিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রাখবে। এদিকে ফের যুদ্ধে জড়ালে বড় বিপদে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র বলে জানিয়েছে সিএনএন। পাকিস্তান ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমঝোতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এদিকে ইরানের ওপার থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নিলে আবার আলোচনায় বসতে রাজি বলে তেহরান জানিয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধবন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরুর লক্ষ্যে ইরানকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রস্তাব উপস্থাপনের জন্য সীমিত সময় দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সিএনএন, তাসনিম, দ্য গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা, এএফপি, রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই।
ফের যুদ্ধে জড়ালে বড় বিপদে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে মাসব্যাপী যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অস্ত্রভা-ারে টান পড়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে গেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, ঠিক এই সময়ে আবারও যুদ্ধে জড়ালে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।বিশেষজ্ঞ ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজন সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে বিপদ বাড়বে। তাদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে গোলাবারুদ ঘাটতির ‘স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি’ তৈরি হয়েছে। তবে চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তির মোকাবিলার করার সক্ষমতা তাদের শেষ হয়েছে।সিএনএন জানিয়েছে, গত সাত সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪৫% স্ট্রাইক মিসাইল ব্যবহার করেছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাডের অন্তত অর্ধেক এবং প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৫০% খরচ করেছে।সেন্টার ফর স্ট্রাটিজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস তাদের এক বিশ্লেষণে এই তথ্য তুলে ধরেছে। যা পেন্টাগনের গোপন তথ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে।চলতি বছরের শুরুতে পেন্টাগন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে কয়েকটি চুক্তি করলেও নতুন করে এসব অস্ত্র মজুদ পূরণ করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পরিকল্পিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত রাখবে।মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে অবরোধ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ইরান প্রস্তাব না দেওয়া পর্যন্ত এবং আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বজায় থাকবে।এদিকে, ইরান এখনওআনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, তেহরানের অবস্থান পরে জানানো হবে।
এই সিদ্ধান্তের কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ইরানকে সতর্ক করেছিলেন যে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। হঠাৎ এই অবস্থান পরিবর্তনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, শাহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ইসলামাবাদ শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। পাকিস্তানে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা আলোচনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রস্তাব’ দেওয়ার জন্য ইরানকে সীমিত সময় দেওয়ার পরিকল্পনা ট্রাম্পের
সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমান প্রশাসন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে চায় না এবং তারা ইরানকে আলোচনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগও দিতে চায় না।
সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, গতকাল বুধবারের সময়সীমার পরও চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট সতর্ক ছিলেন। তিনি যত দ্রুত সম্ভব একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে চান এবং আশা করেছিলেন, সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার চাপ যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগেই ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে বাধ্য করবে।
তবে সিএনএনের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা মনে করেন যে ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা আলোচকদের দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা একমত হতে পারেননি।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্পের ভাষায় তেহরানকে ‘ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রস্তাব’ উপস্থাপনের জন্য আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধ অবসানের প্রতি প্রশাসনের আগ্রহকেই প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে এটি সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তাদের অনিচ্ছারও বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, আলোচনা চলার সময় হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ইরানিদের চাপে রাখবে। যদিও ট্রাম্পের সহযোগীদের মধ্যে এই স্বীকারোক্তিও রয়েছে যে, অবরোধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বিশ্ব অর্থনীতির তত বেশি ক্ষতি হবে।
দুটি জাহাজ জব্দ করার কথা জানাল আইআরজিসি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি থেকে দুটি জাহাজ জব্দ করে সেগুলোকে ইরানের উপকূলে নিয়ে গেছে। আইআরজিসি বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালিতে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘিœত করা ইরানের জন্য একটি রেড লাইন (চরম সীমা) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’ এর আগে খবরে বলা হয়েছিল, ইরানের উপকূলে একটি জাহাজে গুলি চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ওমান উপকূলে হামলার শিকার হয়ে আরেকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টেকসই চুক্তির জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে পাকিস্তান
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁদের সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সমঝোতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এ দুজনের অনুরোধেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুধু যুদ্ধবিরতির মেয়াদই বাড়াননি, বরং একে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মূলত কূটনীতির জন্য বাড়তি সময় দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শেষ চেষ্টা হিসেবে নয়, বরং শুরু থেকেই তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। এই যোগাযোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এরই মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রদূতের একটি বৈঠক হয়েছে এবং তাঁদের আলোচনা এখনো চলছে। মূলত পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি রূপরেখা ইরানকে পৌঁছে দিচ্ছে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠকের ঠিক আগে
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের
দুই দেশের মধ্যে প্রায় দুই মাসের যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা দেয়। ইরানের অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করার অভিযোগে মোট ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সংঘাত বন্ধে বড় ধরনের ছাড় পেতে ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর যে কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, এ নিষেধাজ্ঞা তারই অংশ।
হরমুজ প্রণালিতে এক দিনে
পণ্যবাহী তিন জাহাজে ইরানের হামলা
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে গতকাল বুধবার অন্তত তিনটি কন্টেইনার জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র এবং যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সম্প্রতি ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের প্রতিবাদে দেশটি এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ইউকেএমটিও জানায়, ওমানের উত্তর-পূর্বে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি কন্টেইনার জাহাজে গুলি ও রকেট-চালিত গ্রেনেড দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজটির ওপরের অংশ বা ‘ব্রিজ’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন জানান, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একটি গানবোট তাঁদের জাহাজের কাছাকাছি আসে এবং পরে গুলি চালায়। গানবোটে তিনজন আরোহী ছিলেন। গ্রিস-চালিত এই জাহাজের ক্যাপ্টেন দাবি করেন, হামলার আগে রেডিওর মাধ্যমে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি, যদিও শুরুতে তাঁদের প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আইআরজিসি বলেছে, জাহাজটিকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তা উপেক্ষা করে সেটি।
পরে ইউকেএমটিও জানায়, ইরান থেকে প্রায় আট নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে দ্বিতীয় আরেকটি কন্টেইনার জাহাজে গুলি চালানো হয়েছে। পানামার পতাকাবাহী এ জাহাজে অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি এবং এর নাবিকেরা নিরাপদ আছেন। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তৃতীয় আরেকটি কন্টেইনার জাহাজও গুলিবর্ষণের শিকার হয়েছে। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এ জাহাজটির কোনো ক্ষতি না হলেও সেটি মাঝসমুদ্রে থেমে গেছে। এর নাবিকেরাও নিরাপদ রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে আবার
ইসলামাবাদে বসতে রাজি ইরান
ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নিলে আবার আলোচনায় বসতে রাজি আছে তেহরান। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি এ কথা জানিয়েছেন। ইরানি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত ইরাভানি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পরবর্তী দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।’ তবে নতুন কোনো আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে বলে শর্ত দিয়েছেন তিনি। ইরাভানি বলেন, ‘নতুন কোনো আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে।’ ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র) যদি রাজনৈতিক সমাধান চায়, তবে আমরা প্রস্তুত। আর যদি তারা যুদ্ধ চায়, ইরান সেটির জন্যও তৈরি।’