আনাদোলু এজেন্সি, টিআরটি ওয়ার্ল্ড : ডেনমার্কের স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ গ্রিনল্যান্ড দখলের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনমনীয় মনোভাব প্রকাশের পর সেখানে সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোপেনহেগেন। ইতোমধ্যে ডেনমার্কের সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী কমান্ডের বেশ কয়েকটি ইউনিটকে গ্রিনল্যান্ডে পাঠানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।

স্থানীয় গণমাধ্যম ও ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনীর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বড় একটি যুদ্ধজাহাজ ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সৈন্য গ্রিনল্যান্ডের কাঙ্গারলুসুয়াক শহরে পৌঁছানোর কথা ছিল গত সোমবার সন্ধ্যায়। আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদারে ‘একটি বিশাল অবদান’ হিসেবে দেখা হচ্ছে ডেনমার্কের এই পদক্ষেপকে।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আগ্রাসী মন্তব্যের পর আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ডেনমার্ক সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে। ইতোমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ প্রায় ১০০ জন ডেনিশ সৈন্য অবস্থান নিয়েছেন এবং সমপরিমাণ সৈন্য কাঙ্গারলুসুয়াক অঞ্চলেও মোতায়েন করা হয়েছে। ডেনিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সেনারা ‘আর্কটিক এনডুরেন্স’ নামক একটি সামরিক মহড়ায় অংশ নেবে। যদিও ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এই মহড়াকে পূর্বনির্ধারিত সময়ের চেয়ে এগিয়ে আনা হয়েছে এবং পরিধিও আরও বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ইচ্ছাকে সমর্থন করছেন না দেশটির বেশির ভাগ মানুষ। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন জনগণের বড় অংশই এই উদ্যোগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথ জরিপ অনুযায়ী প্রতি পাঁচজন মার্কিনির মধ্যে একজনেরও কম গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টাকে সমর্থন করছেন। একই জরিপে প্রতি দশজনের একজন মনে করেন প্রয়োজনে এ লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর আবারও গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তবে এই অবস্থান মার্কিন জনমতে তেমন ইতিবাচক সাড়া ফেলতে পারেনি। জরিপে আরও দেখা গেছে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের প্রশ্নে মার্কিন জনগণের মধ্যে তুলনামূলক কম মতভেদ রয়েছে। একইভাবে বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি ব্যবহারে ট্রাম্পের আগ্রহ নিয়েও বড় ধরনের বিভাজন নেই। রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার একটি অভিযানের এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।

এদিকে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। দ্বীপটির নেতারা ডেনমার্কের সঙ্গে ঐক্য বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। ডেনমার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে ন্যাটোর আরও বিস্তৃত ও স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি। তবে হোয়াইট হাউস সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনা মোতায়েন ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

সামরিক বিমান পাঠালেন : ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কেনা নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দ্বীপটির পিটুফিক স্পেস বেসে সামরিক বিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড) এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল বা কেনার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন, তবে সামরিক বাহিনী এই মোতায়েনকে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করেছে।

উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেস—যা আগে থুলে এয়ার বেস নামে পরিচিত ছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। বেসটি মূলত ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন ও কানাডীয় যৌথ প্রতিরক্ষা সংস্থা 'নোরাড' সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছে, উত্তর আমেরিকা রক্ষার নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই সেখানে বিমান পাঠানো হয়েছে। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, এই মোতায়েন কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা পরিকল্পনারই অংশ।

এই সামরিক তৎপরতার বিষয়ে ডেনমার্ক সরকারের সাথে সমন্বয় করা হয়েছে এবং গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষকেও আগে থেকে অবহিত করা হয়েছে বলে নোরাড দাবি করেছে। তবে সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান, বিপুল খনিজ সম্পদ এবং এই অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে অত্যন্ত আগ্রহী। এর আগে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে শুল্ক আরোপ ও বলপ্রয়োগের হুমকি এবং অন্যদিকে সামরিক বিমানের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যদিও নোরাড একে রুটিন মহড়া বলছে, তবে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আর্কটিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এই পদক্ষেপ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড এখনো তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনড় অবস্থানে রয়েছে।