সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,টিআরটি ওয়ার্ল্ড : ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটকের জন্য পরিচালিত মার্কিন অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনী যেভাবে সহজে প্রবেশ করতে পেরেছে, ইরানের ক্ষেত্রে সমীকরণটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আধুনিক। মূলত চীন ও রাশিয়ার উন্নত প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে এই সিস্টেম।
সম্প্রতি তেহরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর ইরান তার আকাশসীমা সুরক্ষিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত রুশ নির্মিত এস-৩০০ এবং বুক-এমটুএস সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল ছিলো। যা গত মাসের মার্কিন অভিযানে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার রাডারগুলো একে অপরের সাথে নেটওয়ার্কযুক্ত ছিল না এবং দুর্নীতির কারণে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়নি। ফলে মার্কিন ইএ-১৮জি গ্রোলার বিমানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধে সেগুলো সহজেই অকেজো হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ইরান গত এক বছরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। তেহরান বর্তমানে চীনের সবচেয়ে উন্নত ‘এইচকিউ-৯বি’ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম ব্যবহার করছে। অত্যন্ত শক্তিশালী এই মিসাইলটি প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এর গতিও শব্দের চেয়ে চার গুণ বেশি। চীনের সাথে ‘তেল বনাম অস্ত্র’ চুক্তির মাধ্যমে ইরান এই সর্বাধুনিক সরঞ্জামগুলো সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এখন ইরানের হাতে রয়েছে। যা ভেনেজুয়েলার কাছে থাকা এস-৩০০ এর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাদের দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার। রাশিয়ার এস-৩০০ এর আদলে তারা তৈরি করেছে ‘বাভার-৩৭৩’, যা ৩০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লায় কাজ করতে পারে। ইরানের এই হাইব্রিড প্রতিরক্ষা কৌশলে রুশ, চীনা এবং দেশীয় সিস্টেমগুলো একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে কাজ করে। ফলে মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। গত জুনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বেশ কিছু পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তেহরান দ্রুততম সময়ে তাদের এই আকাশ প্রতিরক্ষা দেয়াল আরও নিশ্ছিদ্র করেছে। ফলে ভেনেজুয়েলার মতো একপাক্ষিক অভিযান ইরানের ক্ষেত্রে পরিচালনা করা পেন্টাগনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আকাশসীমা খুলে দিল ইরান: সাময়িক বন্ধ রাখার পর আবারো আকাশসীমা খুলে দিয়েছে ইরান। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এখন বিমানগুলোকে তেহরানের দিকে প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। অনলাইন ফ্লাইট ট্র্যাকিং সেবা ফ্লাইটরাডার২৪ বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে, ইরানের আকাশসীমায় চলাচলে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নোটিশ (নোটাম)-এর মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং একাধিক বিমান দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইরান সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক বেসামরিক ফ্লাইটছাড়া সব ধরনের বিমান চলাচল বন্ধ রেখেছিল। শুধু অনুমোদিত আন্তর্জাতিক আগমন ও প্রস্থান ফ্লাইটকে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। প্রাথমিক ঘোষণায় জানানো হয়েছিল, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তেহরানের আকাশসীমা বন্ধ থাকবে এবং কেবল বেসামরিক কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি পাওয়া নির্দিষ্ট ফ্লাইটই চলাচল করতে পারবে। ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত আসে। বর্তমানে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে এবং এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত রাখা হচ্ছে বলে তাকে অবহিত করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রতি বারবার সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কঠোর ব্যবস্থা’ নিতে পারে। এছাড়া, জি-৭ এর সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ইচ্ছাকৃত সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়েছেন। তারা ইরান সরকারকে সংযম প্রদর্শন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তারা এই বিক্ষোভ ও অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তবে পশ্চিমা দেশগুলো এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিক্ষোভ নিয়ে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।