নিউজগার্ড
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘বড় পরিসরের হামলা’ চালানোর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব কনটেন্টে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিমান থেকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কারাকাসের রাস্তায় উল্লসিত জনতা নেমে এসেছে বা শহরের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে—যা সবই সম্পূর্ণ ভুয়া।
এই ভুয়া কনটেন্টের পাশাপাশি কিছু বাস্তব ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান কারাকাসের আকাশে উড়ছে এবং রাতের অন্ধকারে বিস্ফোরণের আলো জ্বলছে। যাচাইকৃত তথ্যের অভাব ও এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির কারণে সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তব এবং ভুয়া তথ্য আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একটি ছবি পোস্ট করেন—যেখানে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা মাদুরোকে যুদ্ধজাহাজে তোলা হচ্ছে—ততক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এজেন্টদের সঙ্গে মাদুরোর ভুয়া ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা নিউজগার্ড জানিয়েছে, এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও টিকটকে এসব এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও মিলিয়নের বেশি বার দেখা ও শেয়ার করা হয়েছে। ফ্লোরিডার কোরাল গেবলস শহরের মেয়র ভিন্স লাগো ইনস্টাগ্রামে একটি ভুয়া ছবি পোস্ট করেন, যেখানে মাদুরোকে ডিইএ এজেন্টদের ঘিরে দেখা যায়। তিনি দাবি করেন, মাদুরো ‘একটি নার্কো-সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা, যা দেশের জন্য হুমকি’। পোস্টটি দেড় হাজারের বেশি লাইক পেয়েছে এবং প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত তা সরানো হয়নি।
নিউজগার্ডের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন বলেন, কারাকাসের ভুয়া ছবিগুলো বাস্তব ঘটনার সঙ্গে এতটাই মিল রাখছে যে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অনেক এআই-নির্মিত বা প্রেক্ষাপটের বাইরে নেওয়া ছবি বাস্তব ঘটনাকে খুব বেশি বিকৃত করছে না। কিন্তু বাস্তব সময়ের তথ্যের ঘাটতি পূরণ করতে এসব নাটকীয় ভুয়া ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে, যা তথ্যযুদ্ধে নতুন কৌশল—এবং যাচাইকারীদের জন্য তা আরও কঠিন।’
নিউজগার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত পাঁচটি ভুয়া বা প্রেক্ষাপট-বহির্ভূত ছবি এবং দুটি ভিডিও শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে একটি এআই-নির্মিত ছবিতে দেখা যায়, কালো হুড পরানো মাদুরোর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এক সেনাসদস্য। আরেকটি ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর হেলিকপ্টারকে ভেনেজুয়েলান সামরিক ঘাঁটিতে নামতে দেখা যায়—যদিও এটি আসলে গত জুনে নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে ধারণ করা হয়েছিল।
নিউজগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত করা এই সাতটি ভুয়া ছবি ও ভিডিও শুধু এক্স প্ল্যাটফর্মেই ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে।
অতীতের বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ও ছবি নতুন করে ছড়িয়ে দিয়ে সাম্প্রতিক হামলার অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কট্টর ডানপন্থী প্রভাবক লরা লুমার এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ মাদুরোর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে। পরে জানা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের। লুমার পরে পোস্টটি মুছে দেন।
আরেক ডানপন্থী প্রভাবক ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদী অ্যালেক্স জোনস এক্সে কারাকাসে বিপুল জনতার উল্লাসের একটি চিত্র পোস্ট করে লেখেন, ‘কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক মাদুরোর পতনে লাখো ভেনেজুয়েলান রাস্তায় নেমে এসেছে।’ ভিডিওটি এখনো অনলাইনে রয়েছে এবং ২২ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে। এক্সের কমিউনিটি নোটস জানায়, ভিডিওটি অন্তত ১৮ মাস পুরোনো। রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা গেছে, এটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মাদুরোর বিতর্কিত নির্বাচনী জয়ের পর কারাকাসে হওয়া এক বিক্ষোভের দৃশ্য। এক্সের এআই চ্যাটবট গ্রোকও জোনসের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানায়, ‘বর্তমান সূত্রগুলো অনুযায়ী আজ কারাকাসে এমন কোনও উদযাপন হয়নি; বরং সেখানে মাদুরো-পন্থী সমাবেশ দেখা গেছে।’