রয়টার্স, বিবিসি : জেনেভায় গতকাল মঙ্গলবার ইরানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পারমাণবিক আলোচনায় তিনি পরোক্ষভাবে অংশ নেয়ার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়াও ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে ইরান একটি পারমাণবিক চুক্তি করবে। সোমবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরানের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য পারমাণবিক আলোচনায় আমি পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকব। এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। আমার মনে হয়, তারা চুক্তি না করলে যে ফলাফল হতে পারে, তা চাইবে না।

সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছে, আলোচনায় সফলতা না পেলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার সোমবার হাঙ্গেরিতে সফরকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি করা সহজ হবে না। কূটনৈতিকভাবে চুক্তির সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু এটা খুব কঠিন হবে। তিনি আরও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে বাস্তব চুক্তি করা কঠিন, কারণ আমরা এমন উগ্র শিয়া ধর্মগুরুদের সঙ্গে লড়াই করছি, যারা ভৌগোলিক নয়, ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সোমবার জাতিসংঘের পারমাণবিক তত্ত্বাবধান সংস্থার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাতের পর তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, জেনেভায় তাদের লক্ষ্য ন্যায্য ও সমতামূলক চুক্তি অর্জন। তিনি আরও জানিয়েছেন, আলোচনায় হুমকির মুখে আত্মসমর্পণের কোনও ইচ্ছা নেই।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ উপলক্ষে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের মহড়া: যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস ‘আব্রাহাম লিংকন’ ইরানের কাছাকাছি অবস্থান করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইরানের সামরিক কর্মসূচি ও সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী বিক্ষোভ দমনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছে। আর এমন সময়ে বিবিসি ভেরিফাই এ উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা আজ মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ইরান বলেছে, বৈঠকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ওয়াশিংটন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়।

আব্রাহাম লিংকন নামের বিমানবাহী রণতরিটিতে রয়েছে তিনটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। এ ছাড়া এতে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ মোট ৯০টি উড়োজাহাজ এবং প্রায় ৫ হাজার ৬৮০ নৌবাহিনীর সদস্য রয়েছেন। জানুয়ারির শেষ দিকে রণতরিটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছিল, তবে এত দিন পর্যন্ত উপগ্রহ চিত্রে সেটি দেখা যায়নি। এবার উপগ্রহ চিত্রে সেটি ধরা পড়েছে। ওই চিত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে রণতরিটি ওমান উপকূলের কাছে ইরান থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকেও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এটি ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে। আব্রাহাম লিংকনকে মোতায়েন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়কে আরও স্পষ্ট করেছে। স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই দেখতে পেয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের সংখ্যা উল্লেখজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র কী কী সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে : ইউরোপের মহাকাশ সংস্থা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আরব সাগরে ওমান উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ মাইল (২৪০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থান করছে। জানুয়ারিতে জাহাজটি ওই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল বলে জানা গেলেও এত দিন সেটিকে দেখা যায়নি। সাগরে চলাচলকারী জাহাজকে স্যাটেলাইটে (উপগ্রহ) ধারণ করার সক্ষমতা সীমিত। স্থলভাগে থাকা সামরিক সরঞ্জামগুলো উপগ্রহে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হয়। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিবিসি ভেরিফাই এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি যুদ্ধজাহাজের অবস্থান শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক শক্তিচালিত নিমিৎজ-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও। এতে তিনটি ডেস্ট্রয়ারসহ হামলা চালানোর সক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম আছে।

এ ছাড়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতাসম্পন্ন আরও দুটি ডেস্ট্রয়ার এবং উপকূলসংলগ্ন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত তিনটি জাহাজও শনাক্ত হয়েছে। এগুলো বর্তমানে উপসাগরের বাহরাইন নেভাল স্টেশনে অবস্থান করছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মার্কিন ঘাঁটির কাছে আরও দুটি ডেস্ট্রয়ার দেখা গেছে আর লোহিত সাগরে রয়েছে আরেকটি ডেস্ট্রয়ার। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন উড়োজাহাজ চলাচলের বিষয়টিকেও পর্যবেক্ষণে রেখেছে বিবিসি ফেরিফাই। এতে দেখা গেছে, জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে এফ-১৫ এবং ইএ-১৮ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মার্কিন পণ্যবাহী বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ এবং যোগাযোগসহায়ক উড়োজাহাজের চলাচলও বেড়েছে।