এক মাসের ব্যবধানে ফের তুষারঝড়ের কবলে যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্কসহ আমেরিকার প্রায় ২০ অঙ্গরাজ্য এই তুষারঝড়ে আক্রান্ত। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে নিউইয়র্কসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে। স্হানীয় সময় রোববার বিকাল পাঁচটা এই তুষার ঝড় শুরু হয়। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তা চলছে।
এই তুষারঝড়ের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। লং আইল্যান্ড রেল রোড সোমবার রাত ১টা থেকে পরিসেবা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি (এমটিএ) জানিয়েছে, সাবওয়ে ও বাস পরিসেবা নিরাপত্তা বিবেচনায় সীমিত আকারে চলবে এবং বেশ কয়েকটি উন্মুক্ত লাইনে বিলম্ব হতে পারে। স্ট্যাটেন আইল্যান্ড ফেরি সীমিত সময়সূচিতে পরিচালিত হবে। নিউ জার্সিতে বাস ও লাইট রেল পরিসেবা স্থগিত করেছে এবং বহু রুটে ট্রেন পরিসেবা বাতিল বা সীমিত করা হয়েছে।
বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফ্লাইট অ্যাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে। নিউইয়র্ক অঞ্চলের জন এফ কেনেডি, লাগুর্ডিয়া, নিউয়ার্ক এ বাতিলের সংখ্যা সর্বাধিক। রোববার দুপুর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তিন হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল এবং প্রায় দুই হাজার নয়শো ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও লাগার্ডিয়া বিমানবন্দর–এ বাতিলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ফিলাডেলফিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রোনাল্ড রেগান ওয়াশিংটন ন্যাশনাল বিমানবন্দর এবং বস্টন লগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিমান বিশ্লেষণ সংস্থা জানিয়েছে, সোমবার লাগার্ডিয়া বিমানবন্দর–এ নির্ধারিত ফ্লাইটের ৮২ শতাংশ ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। ফলে সোমবার সকালের বিমান চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটিতে ১২ থেকে ১৮ ইঞ্চি এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, ব্রুকলিন ও কুইন্সের দক্ষিণাংশে ১৮ থেকে ২৪ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষারপাত হতে পারে। লং আইল্যান্ডের সাউথ শোর এলাকায় দুই ফুট পর্যন্ত তুষার জমার সম্ভাবনা রয়েছে। নিউ জার্সি শোর ও আশপাশের এলাকাতেও ১৮ ইঞ্চির বেশি তুষারপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় উচ্চ জোয়ারের সময় ১ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত জলপ্লাবনের ঝুঁকি রয়েছে।
ভারী তুষারের কারণে বিদ্যুৎ লাইনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কন এডিশন সহ ইউটিলিটি সংস্থাগুলো অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করলেও ঘণ্টায় ৩৯ মাইলের বেশি বাতাসে মেরামতকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সিটি কর্তৃপক্ষ নজরদারি জোরদার করেছে এবং বিকল্প পার্কিং বিধি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে যাতে দ্রুত তুষার অপসারণ সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঝড়টি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে শীর্ষ ১০ তুষারঝড়ের তালিকায় স্থান করে নিতে পারে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সেন্ট্রাল পার্কে রেকর্ড ২৭ দশমিক ৫ ইঞ্চি তুষারপাত হয়েছিল; এবারের ঝড় সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পর সবচেয়ে বড় তুষারঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো তুষারঝড়ে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে ট্রাই-স্টেট অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শিক্ষা, পরিবহন, প্রশাসন ও বিমান চলাচলÍসব ক্ষেত্রেই নেমে এসেছে অচলাবস্থা। কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে না বের হওয়া, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধ মজুত রাখা এবং সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত পুরো অঞ্চল উচ্চ সতর্কতায় থাকবে বলে জানিয়েছে সিটি ও অঙ্গরাজ্য প্রশাসন।
এদিকে বিবিসি ও রয়টার্স জানায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে স্থানীয় সময় গত সোমবার একটি প্রবল শীতকালীন ঝড় আঘাত হেনেছে। রেকর্ড তুষারপাতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে লাখো মানুষের জীবন। বাতিল করা হয়েছে হাজারো উড়োজাহাজের চলাচল। রোড আইল্যান্ড ও ম্যাসাচুসেটসের বড় একটি অংশ ৩৭ ইঞ্চি বা প্রায় ৯৪ সেন্টিমিটার পুরু তুষারে ঢাকা পড়েছে। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ১৯ ইঞ্চির বেশি পুরু তুষার জমেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি নগরটিতে আবহাওয়া-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। রাষ্ট্রীয় একটি সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, নিউইয়র্কে এখন এমন পরিস্থিতি, সেখানে চলাচল করা ‘কার্যত অসম্ভব’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝড় আর ব্যাপক তুষারপাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলজুড়ে ছয় লাখের বেশি বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউজার্সি ও ম্যাসাচুসেটস। উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে নর্থ মেইন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় শীতকালীন ঝড়ের সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পরে কানাডার পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উত্তরাংশে এই সতর্কতা দেওয়া হয়।
বোস্টনে ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের আবহাওয়াবিদ ক্যান্ডিস হ্রেন্সসিন তুষারপাতের ভয়াবহতা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘অন্য সবার মতো আমরাও অবাক হয়ে গিয়েছি।’ রোড আইল্যান্ড ও পার্শ্ববর্তী কানেকটিকাটে ‘প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণের’ ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর মাউরা হ্যালি সেখানে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
মাউরা অনলাইন পোস্টে বলেন, ‘আমি দক্ষিণ-পূর্ব ম্যাসাচুসেটসে প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছি। সেই সঙ্গে মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা প্রতি ঘণ্টায় ৪০ মাইলে (প্রায় ২৫ কিলোমিটার) কমিয়ে আনা হয়েছে।’ উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরগুলো থেকে ছেড়ে যেতে চাওয়া কিংবা অবতরণে ইচ্ছুক ৫ হাজার ৭০৬টির বেশি উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটটি বলেছে, নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৯৮ শতাংশ ও জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৯১ শতাংশ উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল হয়েছে। এসব বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করেন। দুটি জায়গাতেই প্রায় ১৫ ইঞ্চি বা ৩৮ সেন্টিমিটার পুরু তুষার জমেছে। বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সোমবার উড্ডয়নের কথা থাকা প্রায় ৯২ শতাংশ উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল করা হয়েছে। নিউজার্সির নিউয়ার্ক লিবার্টি বিমানবন্দরের ৯২ শতাংশ এবং ফিলাডেলফিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় ৮০ শতাংশ উড়োজাহাজের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।