সিএনএন, এএফপি : গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় টিভি অনুষ্ঠান সানডে শোতে উপস্থিত হয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সেখানে তিনি ওই অভিযানকে সফল হিসেবে তুলে ধরেন। ভ্যান্স ওই অভিযান নিয়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে এক মিনিটের কম সময়ের মধ্যে চারবার তাঁর মুখ থেকে ‘অবিশ্বাস্য’ বা ‘অবিশ্বাস্যভাবে’ শব্দটি উচ্চারিত হয়। ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিতে অভিযান চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কঠোরভাবে সে অভিযানকে বৈধ হিসেবে সমর্থন করেছিলেন। তবে এবার ইরানে হামলার দুই সপ্তাহ হয়ে যাওয়ার পরও ভ্যান্সকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সমর্থন দিতে দেখা যায়নি।
গত শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনায় এক সংবাদকর্মী ভ্যান্সের কাছে জানতে চান, তিনি ট্রাম্পকে যুদ্ধের শুরুর দিকে এবং খুব সম্প্রতি কী পরামর্শ দিয়েছেন? ভ্যান্সের উত্তরটি ছিল দীর্ঘ, তবে যুদ্ধ সম্পর্কে নিজের ব্যক্তিগত মত প্রকাশ তিনি এড়িয়ে যান।
ভ্যান্স বলেন, ‘আমি আপনাদের হতাশ করতে চাই না। কিন্তু আমি এখানে এসে, ঈশ্বর ও সবার সামনে বলব না যে সেই গোপন কক্ষে ঠিক কী বলেছিলাম।’ ইরানে হামলার সময় ট্রাম্প একটি পর্যবেক্ষণ কক্ষে বসে পুরো ঘটনাটি দেখেছিলেন, এই কক্ষকে সিচুয়েশন রুম বলা হয়ে থাকে। ভ্যান্সের আগের মন্তব্যগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপ না করাকে সমর্থন করেন। সিনেটর থাকাকালে ২০২৩ সালে ভ্যান্স একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ট্রাম্পকে মোটাদাগে সফল প্রেসিডেন্ট বলা যায়, কারণ তিনি যুদ্ধে জড়াননি। ২০২৪ সালে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়। এতে অনেক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হবে।
ভ্যান্স বলতে থাকেন, ‘এর একটি কারণ হলো আমি জেলে যেতে চাই না। আরেকটি কারণ হলো, আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে তাঁর পরামর্শদাতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া জরুরি, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই পরামর্শদাতারা তাঁদের কথা মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করেন।’ এ এক অদ্ভুত উত্তর। তবে এর মধ্য দিয়ে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে ভ্যান্স এই বিষয়ে নিজেকে কীভাবে এড়াচ্ছেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ভ্যান্সের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্যগুলো হলো, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে নিশ্চয়তা দেওয়া। ইরান যুদ্ধকে ভ্যান্স যে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ্য সমর্থন দেননি, তা শুরু থেকেই চোখে পড়ছিল। এখন তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ভ্যান্স শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে বলেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে ট্রাম্প সেনা অভিযানকে সমর্থন করছেন, তখন তিনি অবস্থান বদল করেন এবং প্রেসিডেন্টকে দ্রুত ও কঠোর হামলা চালাতে উৎসাহিত করেন। ভ্যান্সের আগের মন্তব্যগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপ না করাকে সমর্থন করেন। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর ভ্যান্স দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা কথা বলছেন না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে মাত্র আটটি পোস্ট করা হয়েছে।
সিনেটর থাকাকালে ২০২৩ সালে ভ্যান্স একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন। সেখানে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ট্রাম্পকে মোটাদাগে সফল প্রেসিডেন্ট বলা যায়, কারণ তিনি যুদ্ধে জড়াননি। ২০২৪ সালে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়। এতে অনেক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হবে। ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন এক ইরানি কমান্ডারকে হত্যার আদেশ দেন, তখনো যুদ্ধের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন ভ্যান্স। এ ছাড়া গত বছর ‘সিগন্যাল গেট’ নামে আলোচিত ব্যক্তিগত বার্তাগুলোতে দেখা গেছে, তিনি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে অনীহ ছিলেন।
কিন্তু ভ্যান্স এখন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প সাধারণত চান ভাইস প্রেসিডেন্টসহ চারপাশের মানুষেরা তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য দেখাক। এমন অবস্থায় ভ্যান্সকে প্রকাশ্যে মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে দেখা গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকেরা এটিকে রাজনীতির খেলা হিসেবে দেখবেন। তাঁরা বলবেন, ভ্যান্স ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর এই দূরত্ব বজায় রাখার আচরণ রাজনৈতিকভাবে অসুবিধা তৈরি করতে পারে। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর ভ্যান্স দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা কথা বলছেন না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে মাত্র আটটি পোস্ট করা হয়েছে।
তবে উল্লেখজনক বিষয় হলো, ভ্যান্স সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার কম করছেন। জেডি ভ্যান্সের ব্যক্তিগত ও সরকারি অ্যাকাউন্টে করা পোস্টগুলোর মধ্যে কিছু ইরান সংক্রান্ত ছিল। এগুলো ছিল মূলত নিহত সেনাদের খবর বা ট্রাম্পের মন্তব্য শেয়ার করা সংক্রান্ত পোস্ট। তিনি ইরান সম্পর্কে ফক্স নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারও পোস্ট করেছেন। তবে ২ মার্চের ওই সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু ইরান হলেও ভ্যান্স মূলত যুদ্ধ সম্পর্কে নিজের ব্যক্তিগত মতামত এড়িয়ে গেছেন। ভ্যান্স বারবার ট্রাম্প কী ভাবছেন বা কী করছেন, সেটাই বলেছেন। যেমন ‘প্রেসিডেন্ট দেখছেন’, ‘প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন’, ‘প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত হতে চেয়েছেন’, ‘প্রেসিডেন্ট খুব স্পষ্ট’, ‘প্রেসিডেন্ট শুধু চাইছেন’ এমন সব কথা।
এক দিক থেকে এটি ভ্যান্সের কাজেরই অংশ। কারণ, তাঁকে প্রেসিডেন্টের মতামতই তুলে ধরতে হয়। কিন্তু জুনে তাঁর অবস্থান এমন ছিল না। তখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর হামলার পর তিনি অনেক বেশি নিজের ব্যক্তিগত মত ও মনোভাব নিয়ে কথা বলেছিলেন। এবার ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ফক্স টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স আশ্বাস দেন, এই যুদ্ধ ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো কয়েক দশক ধরে চলবে না।
এর বাইরে তিনি ইরান নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই মন্তব্য করেছেন। গত সোমবার ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ফায়ার ফাইটারস–এর এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি শুধু সংক্ষেপে নিহত সেনাসদস্যদের কথা উল্লেখ করেছেন। আর শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনায় দেওয়া তাঁর বক্তৃতার বড় অংশজুড়ে ছিল অর্থনীতি।
ভ্যান্সের বিষয়ে ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। দুজনের কেউই খুব জোর দিয়ে অস্বীকার করেননি যে ভ্যান্সের অবস্থান প্রেসিডেন্টের থেকে কিছুটা আলাদা। গত সোমবার ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয় তাঁর সঙ্গে ভ্যান্সের কোনো মতভেদ আছে কি না। তিনি উত্তর দেন, ‘আমি তেমনটা মনে করি না। না। না। আমাদের মধ্যে এ বিষয়ে বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে।’ কিন্তু এরপর তিনি ইঙ্গিত দেন যে কিছুটা পার্থক্য আছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলব, চিন্তাভাবনার জায়গা থেকে তিনি আমার থেকে একটু ভিন্ন। আমি মনে করি তিনি হয়তো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে কম উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু মোটেও অনিচ্ছুক ছিলেন না।’
গত শুক্রবার হেগসেথের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ভ্যান্স ও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো ‘বিভাজন’ আছে কি না। তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেছেন। হেগসেথ বলেন, প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি ভাইস প্রেসিডেন্ট এই দলের একজন অসাধারণ সদস্য ও নেতা। এই দল ট্রাম্পকে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করে। হেগসেথের দাবি, ভ্যান্স এ দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেন। দর্শনগত বা রাজনৈতিক যেকোনো কারণেই হোক না কেন, ভ্যান্স এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধের গুঞ্জন সম্পর্কে সাংবাদিকদের কিছুই বলেননি। এতে বোঝা যায়, তিনি বিষয়টিকে পুরোপুরি সমর্থন করছেন। ট্রাম্প প্রশাসনও তাঁকে দূরে থাকার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু দেখতে হবে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অবস্থান কত দিন ধরে রাখতে পারেন তিনি।