সিএনএন রয়টার্স : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাম্প প্রশাসনে রীতিমতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক দিনে জ্বালানি তেলের দাম সাময়িক বাড়বে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি যে এমন ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেবে, তা তাঁদের কল্পনারও বাইরে ছিল। হোয়াইট হাউসের ভেতরে এ বিষয়ে হওয়া আলোচনা সম্পর্কে জানেন, এমন একাধিক সূত্র সিএনএনকে তথ্যটি জানিয়েছেন। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে এখন ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দামও বাড়ছে লাফিয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখন আর ট্রাম্পের হাতে নেই বললেই চলে। উল্টো বিদেশে যুদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন, তা তাঁর নিজ দেশের বড় বড় অর্থনৈতিক সাফল্যকেই এখন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তেলশিল্প ও বাজার বিভাগের সাবেক প্রধান ও অভিজ্ঞ জ্বালানি বিশ্লেষক নিল অ্যাটকিনসন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই; বরং তা আরও বৃদ্ধির প্রবল চাপ রয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম কমাতে গত শনি ও সোমবার কর্মকর্তারা জরুরি ভিত্তিতে একগুচ্ছ বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছেন। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে স্থানীয় বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে আইনি বিধিনিষেধ শিথিল করার মতো সীমিত উদ্যোগ, তেমনি রয়েছে বৈশ্বিক তেল–বাণিজ্যে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার মতো চরম কিছু পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ট্রাম্পের সহযোগীদের ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্টের কাছে এসব প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এর ফলে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরানের উপকূলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো কবে নাগাদ আবার নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, তার কোনো লক্ষণই আপাতত দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এর ফলে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরানের উপকূলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো কবে নাগাদ আবার নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, তার কোনো লক্ষণই আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

১০ দিন আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই বড় কোনো জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান তাদের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে চাইছে না। ইরানের পক্ষ থেকে যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কায় হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ জট। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ গতিতে বাড়ছে। গত সোমবার দিনের শুরুতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, যা ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকের পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। পরে দাম কিছুটা কমলেও এর প্রভাব দ্রুতই আছড়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৫১ সেন্ট বেড়েছে। এত দিন কঠোরভাবে নাকচ করে দিলেও এখন কৌশলগত জরুরি তেলের মজুত (এসপিআর) ব্যবহার প্রসঙ্গে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে এই মজুত ব্যবহারের ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে এখনো তীব্র অনীহা কাজ করছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছে। অথচ আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির আধিপত্য ধরে রাখতে গ্যাসের দাম কমানোকেই অন্যতম প্রধান হাতিয়ার করার পরিকল্পনা করেছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারকেরা।

হোয়াইট হাউস সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহান্তে এ উদ্বেগের মাত্রা আরও প্রবল হয়েছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে গিয়ে ঠেকলে এটি স্পষ্ট হয়ে যায়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট নিয়ে সৃষ্ট আতঙ্ক কাটাতে প্রশাসনের শুরুর দিকের পদক্ষেপগুলো কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একগুচ্ছ নতুন প্রস্তাব তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা। জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বর্তমানে এ প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে কাজ করছেন হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল এনার্জি ডমিন্যান্স কাউন্সিলের কর্মকর্তারাও। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জনসভায় জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটসহ প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা জনমনে সৃষ্ট উদ্বেগ প্রশমনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তেল ব্যবসায়ীদের দায়ী করে বলছেন, ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছেন।