আল-জাজিরা ,রয়টার্স : ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এ অভিযান সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের টানাপোড়েন একেবারে নতুন নয়। ২৬ বছর ধরেই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ ও আগ্রাসন দেখিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৯ হুগো চাভেজ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। তখন থেকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কেমন ছিল, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

১৯৯৯ সাল: হুগো চাভেজ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর তিনি আলোচিত ‘বলিভিয়ারা বিপ্লব’ শুরু করেন। ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা সিমন বলিভারের নামে এ বিপ্লব বা আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছিল। বলিভিয়ারা বিপ্লবের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কার ও তেল খাতের জাতীয়করণ করেন। তখন থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

২০০০ সাল: চাভেজ রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। তাঁর সরকার যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত এনজিও ও কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। যুক্তরাষ্ট্র চাভেজের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার ও সংবামাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি আরোপের অভিযোগ আনে।

২০০২ সাল: একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টার জন্য চাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এ অভ্যুত্থানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে ভেনেজুয়েলা। কিন্তু ওয়াশিংটন এ অভিযোগ অস্বীকার করে। এরপর দুদেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাস গড়ে ওঠে।

২০১৩ সাল: হুগো চাভেজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন মাদুরো। তিনি চাভেজের নীতিগুলোই এগিয়ে নেন। তাঁর শাসনের সময় থেকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা শুরু হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।

২০১৪–১৫ সাল: যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ে।

২০১৭–১৯ সাল: ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রবেশ বন্ধ করে এবং তেলের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে। ফলে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বেড়ে যায়।

২০১৮ সাল: মাদুরোর পুনর্র্নিবাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্র্বতী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পান।

২০২৪ সাল: এদমুন্দো গোনসালেসকে হারিয়ে মাদুরো বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সরকার নির্বাচনী ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

২০২৫ সাল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ নতুন করে বাড়ান। ক্যারিবীয় সাগরে ব্যাপক সেনা ও রণতরি মোতায়েন করেন।

২০২৬ সাল: কারাকাসে ব্যাপক বিস্ফোরণ ও মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নেওয়া হয়।

মাদুরো কেন ট্রাম্পের আক্রোশের শিকার হলেন?

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসক আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে মার্কিন বিমান বাহিনী। বর্তমানে মাদুরোকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এই তথ্য জানিয়েছে। এ ঘটনার পর থেকেই পুরো বিশ্বের চোখ এখন মাদুরো ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। সবার প্রশ্ন মাদুরর ওপর কেন আক্রোশ যুক্তরাষ্ট্রের।

যেভাবে ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো

নিকোলাস মাদুরো বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ এবং তার দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা (পিএসইউভি)-এর নেতৃত্বে রাজনীতিতে উঠে আসেন। এক সময়ের বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা মাদুরো চাভেজের উত্তরসূরি হন এবং ২০১৩ সাল থেকে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চাভেজ ও মাদুরোর ২৬ বছরের শাসনামলে তাদের দল জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি), বিচার বিভাগের বড় একটি অংশ এবং নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তবে বিরোধীদের সংগ্রহ করা ভোটের হিসাব বলছে, তাদের প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। মারিয়া কোরিনা মাচাদো নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ হওয়ায় তার জায়গায় বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান গনসালেস। উল্লেখ্য, মাচাদোকে ‘স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সংগ্রামের জন্য’ অক্টোবর মাসে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ভ্রমণনিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি ডিসেম্বর মাসে গোপনে ওসলো পৌঁছে পুরস্কার গ্রহণ করেন; এর আগে তিনি কয়েক মাস আত্মগোপনে ছিলেন।

কেন ভেনেজুয়েলাকে টার্গেট করল ট্রাম্প?

নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে শত শত হাজার ভেনেজুয়েলান অভিবাসীর আগমনের জন্য দায়ী করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৩ সাল থেকে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট ও দমন–পীড়নের কারণে আনুমানিক প্রায় ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীরা তাদেরই একটি অংশ।

ট্রাম্পের দাবি মাদুরো ‘কারাগার ও মানসিক আশ্রমগুলো খালি করে’ সেখানকার বন্দিদের জোর করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। তবে তার এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি তিনি। তবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে ফেন্টানিল ও কোকেনসহ মাদকের প্রবাহ ঠেকানোর দিকেও জোর দিয়েছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার দুটি অপরত্রেন দে আরাগুয়াএবং কার্টেল দে লোস সোলেস কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং দাবি করেছেন, দ্বিতীয়টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাদুরো নিজেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কার্টেল দে লোস সোলেস কোনো কেন্দ্রীয় কাঠামোবদ্ধ সংগঠন নয়; বরং ভেনেজুয়েলার যেসব দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা কোকেন পাচারের সুযোগ করে দিয়েছেনÍতাদের বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

ট্রাম্প মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে তথ্য দিলে যে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, তা দ্বিগুণ করেছেন এবং মাদুরো সরকারকেও এফটিও হিসেবে ঘোষণার কথা বলেছেন। মাদুরো নিজেকে কোনো কার্টেলের নেতা হিসেবে জড়িত থাকার অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের তথাকথিত মাদকবিরোধী যুদ্ধ’-কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের দখল নিতে।